প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চলার পথ যতোই কন্টকাকীর্ণ হোক, দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে তিনি কাজ করে যাবেন। তিনি জানান, টানা ক্ষমতায় থাকার ফলেই উন্নয়ন দৃশ্যমান হচ্ছে, মানুষও সুফল ভোগ করছে। এখন লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গড়া।
রোববার (২ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণে জাতিসংঘের স্বীকৃতি মেলে বাংলাদেশের। যার আনুষ্ঠানিক উদযাপন করতেই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছিলেন।
গণভবন থেকে যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শোনালেন উন্নয়নযাত্রার গল্প। বললেন, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথটা সহজ ছিলো না। প্রতিমূহুর্তে বুলেট, গ্রেনেডের মুখে দাঁড়িয়ে দেশকে এগিয়ে নেয়ার দৃঢ় প্রত্যয় আর একটানা ১৩ বছরের ক্ষমতায় থাকাই দেশের এমন অর্জন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার চলার পথ এত সহজ ছিল না। যে দেশের মাটিতে আমার বাবা-মা-ভাইয়ের হত্যাকারীরা ক্ষমতাসীন, যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষমতাসীন। সে দেশে যে কোনো সময় আমি হারিয়ে যেতে পারি। কিন্তু আমি ভয় পাইনি। পিছনে ফিরে তাকাইনি। আমি এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি দেশের মানুষকে নিয়ে।
‘বাবার কাছ থেকে শেখা দেশকে ভালোবাসা, মানুষকে ভালোবাসা। তার স্বপ্ন চোখে নিয়ে, বুকে নিয়ে, আদর্শ বুকে নিয়ে পথ চলার চেষ্টা করেছি। নিজের জীবনে কোনো চাওয়া-পাওয়া রাখিনি। দেশের মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম সেটাই ছিল বিবেচ্য বিষয়। যে আদর্শ আমার বাবা বুকে ধারণ করতেন, সে আদর্শ নিয়ে চলেছি’।
আরও পড়ুন: দুর্নীতির বিষয়ে কোনো কম্প্রোমাইজ নয়: প্রধান বিচারপতি
তিনি আরো বলেন, ‘এমন একটি সময় যখন আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী এবং আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করছি। দেশে-বিদেশে আমাদের যত বাঙালি, সবাইকে আমি অভিনন্দন জানাই। বাংলাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলের তৃণমূলের মানুষকে আমি অভিনন্দন জানাই’।
‘আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যার নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। শুধু স্বাধীনতা নয়, বাঙালি জাতিকে একটি উন্নত মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন’।
‘আমি শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় চার নেতার প্রতি, ৩০ লাখ শহীদের প্রতি, দুই লাখ মা-বোনের প্রতি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জানাই সালাম’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে রাজনীতি করেছি কিন্তু কখনো ভাবিনি বড় একটা দায়িত্ব নিতে হয়। আমার বাবা রাজনীতি করেছেন আমরা পাশে থেকেছি, কাজ করেছি। স্কুল জীবন থেকে বেরিয়ে কলেজ, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়। একজন কর্মী হিসেবেই সক্রিয় ছিলাম’।
‘দুর্ভাগ্য আমাদের ৭৫'র ১৫ আগস্ট আমরা সব হারিয়েছি। জানি না কী অপরাধ ছিল আমার বাবা-মা-ভাইদের। আমার বাবা এ দেশের মানুষের ভাগ্য গড়তে চেয়েছিলেন। তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছেন এ দেশের মানুষের জন্য। তারই নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি’।
‘একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে মাত্র সাড়ে ৩ বছরে তিনি স্বল্পোন্নত দেশে উন্নীত করেন। তিনি চেয়েছিলেন ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং এ দেশের মানুষকে ক্ষমতাশীল করে দিয়ে দেশের উন্নয়নকে তরান্বিত করা। কিন্তু সে সুযোগটা তিনি আর পাননি’।
‘স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আমরা স্বীকৃতি পেয়েছিলাম। এরপর ক্ষমতায় আসে সামরিক জান্তা। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল, একের পর এক ক্যু, সেগুলো চলতে থাকে। বাংলাদেশের মানুষ অন্ধকারেই থেকে যায়’।
সরকার প্রধান বলেন, আজ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথম স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছিল। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক আমাদের নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে আমরা থেমে থাকিনি। আমরা এগিয়ে চলেছি। সব শর্ত পূরণ করে আমরা চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেয়েছি। ২০২১-এর ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে।
আরও পড়ুন: ৪৩তম বিসিএসের প্রিলিমিনারির ফল জানুয়ারিতে
শেখ হাসিনা বলেন, বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে এ অর্জন জাতির জন্য কৃতিত্ব ও গৌরবের। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সব সময় বলতেন, 'আমার দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে, এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন।' এই অল্প কথায় তিনি এটাই বুঝিয়েছিলেন তিনি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে তাদের উন্নত জীবন তিনি দিতে চেয়েছিলেন’।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমার যে লক্ষ্য, জাতির পিতার বঙ্গবন্ধুর যে লক্ষ্য সে লক্ষ্যটা আমাদের অর্জন করতেই হবে। সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য নতুন প্রজন্ম এই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সেটাই আমাদের আশা। সেভাবেই তাদের তৈরি করতে চাই’।
তিনি বলেন, গ্রামে বসে যাতে মানুষ সব সুবিধা পায় সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। কোনো মানুষ গৃহহীন, ভূমিহীন থাকবে না এটাই আমাদের লক্ষ্য। প্রত্যেকটা পরিবারকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে ‘আমার বাড়ি, আমার খামার’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
পথ যত কন্টকাকীর্ণ বা বন্ধুর পথই হোক, বাংলাদেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, দেশকে ভালোবাসলে চলার পথ খুব সহজ হয় না। সাময়িক কোন উন্নয়ন নয়, আগামী একশ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করছে। দেশ ও মানুষের জন্য উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত হতে হবে।
একাত্তর/আরবিএস
