বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক পদে প্রখ্যাত অটিজম বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদের মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে সমালোচনা করেছেন অনেকে। সায়মা ওয়াজেদ আদৌ এই পদের যোগ্য কি না, নাকি স্বজনপ্রীতির কারণেই এই মনোনয়ন, সেই বিষয়েও অনেকে সন্দিহান ছিলেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের জামাতা ফাহাম আব্দুস সালামকেও এ বিষয়ে বেশ সরব থাকতে দেখা গেছে। সায়মা ওয়াজেদের ক্রিডেনশিয়াল দিয়ে নাকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা পৃথিবীর কোনো বড় পাবলিক হেলথ অর্গানাইজেশনের এন্ট্রি লেভেলের চাকরিতেও ঢোকা যাবে না!
এসব ভিত্তিহীন কথাবার্তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের পরিচালক পদে ৮-২ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এসইএআরও’র অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজ এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক পদে নির্বাচন প্রক্রিয়া
• ২০২৩ সালের ২১ এপ্রিল আঞ্চলিক পরিচালক পদের জন্য প্রস্তাব জমা দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। ৪ আগস্ট ছিলো প্রস্তাব জমা দেয়ার শেষ দিন।
• ১৮ আগস্টের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সকল সদস্য রাষ্ট্রগুলির কাছে প্রস্তাবসমূহ পাঠানো হয়।
• প্রস্তাবগুলো পাঠানোর পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সেক্রেটারিয়েট দ্বারা পরিচালিত একটি ওয়েব ফোরাম খোলা হয়।
• এই ফোরাম সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সকলের প্রশ্নের উত্তর দেয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সকল সদস্য রাষ্ট্র এবং প্রার্থীদের জন্য ফোরামটি উন্মুক্ত ছিল।
• এসইএআর এর বর্তমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা এবং এগুলোর কোন কোন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে এই বিষয়ে প্রার্থীর বিশ্লেষণ, সমস্যাগুলো মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য কী হতে পারে সে বিষয়ে প্রার্থী তার দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন।

• প্রত্যেক প্রার্থী সর্বোচ্চ ২০ মিনিটের মৌখিক বিবৃতি দিয়েছেন।
• কোনো বিষয় অস্পষ্ট থাকলে সে বিষয়ে সদস্যরা প্রশ্ন করেছেন ও প্রার্থী উত্তর দিয়েছেন (সর্বোচ্চ ৪০ মিনিটের সেশন)
• গোপন ব্যালট ভোটের মাধ্যমে সদস্যরা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে মনোনীত করেন।
• ২০২৪ এর জানুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যনির্বাহী বোর্ড মনোনীত প্রার্থীকে নিয়োগ প্রদানের জন্য গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিবে।
• ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন আঞ্চলিক পরিচালকের মেয়াদ শুরু হবে।
সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের যোগ্যতা
• ১৯৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক এবং ২০০২ সালে ক্লিনিকাল মনস্তত্ত্বে স্নাতকোত্তর অর্জন করেন।
• ২০০৪ সালে স্কুল সাইকোলজির ওপর বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি অর্জন করেন। লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্কুল মনোবিজ্ঞানী হিসেবে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অরেঞ্জ কাউন্টি ও ডুভাল কাউন্টির পাবলিক স্কুল সিস্টেমে কাজ করছেন।
• ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় তিনি বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নের ওপর গবেষণা করেন। এ বিষয়ে তাঁর গবেষণাকর্ম ফ্লোরিডার একাডেমি অব সায়েন্সের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠ সায়েন্টিফিক উপস্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
• বর্তমানে তিনি ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘সাংগঠনিক নেতৃত্ব’ বিষয়ে পিএইচডি করছেন।
• সায়মা ওয়াজেদের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে রয়েছে তিনটি আন্তর্জাতিক রেজোলিউশনের খসড়া তৈরি করা, যা পরবর্তীতে জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলো দ্বারা গৃহীত হয়েছে।
• ২০১৯ সাল থেকে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের মানসিক স্বাস্থ্য ও অটিজম বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
• ২০১৪ সাল থেকে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অভিজ্ঞ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।
• ২০২৩ সালের আগস্টে তিনি চাথাম হাউজের গ্লোবাল হেলথ প্রোগ্রামে একজন সহযোগী ফেলো হিসেবে নিযুক্ত হন, যেখানে তিনি ২০২২ সাল থেকে ইউনিভার্সাল হেলথ কমিশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

• ২০২০ সাল থেকে তিনি ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম এর ‘থিম্যাটিক এম্বাসেডর ফর ভালনারেবিলিটি’ হিসেবে কাজ করেছেন।
• ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এসইএআরও এর শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।
• বাংলাদেশে তিনি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০-২০২৫ এর মুখ্য উপদেষ্টা। ২০১২ সাল থেকে তিনি অটিজম ও স্নায়ুবিকাশজনিত উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবে নিয়োজিত আছেন।
• বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডজান্ট ফ্যাকাল্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ভিজিটিং স্পেশালিস্ট এবং ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে কাজ করছেন।
• যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন, রুয়ান্ডায় কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সভা, জাপানে নারী বিশ্ব সমাবেশ, স্কটল্যান্ড ও মিশরে কপ-২৬ ও ২৭, শ্রীলংকায় জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠক, ক্যাম্বোডিয়ায় গ্লোবাল চাইল্ড নিউট্রিশন ফোরাম, ভারতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম, পর্তুগালে ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অব সাইকিয়াট্রিসহ বিভিন্ন উঁচু-স্তরের সম্মেলন ও আসরে বক্তৃতা করতে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
• তার কর্মময় জীবনে তিনি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, তার মধ্যে আছে ডব্লিউএইচও এসইএআরও এর ‘সাইটেশন ফর এক্সেলেন্স ইন পাবলিক হেলথ’, ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট প্রাক্তন শিক্ষার্থী পুরস্কার, যুক্তরাষ্ট্রে শেমা কোলাইনু কর্তৃক আন্তর্জাতিক চ্যাম্পিয়ন পুরস্কার। তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে একজন উদ্ভাবনী নারী নেত্রী হিসেবে তালিকাভুক্ত।

সায়মা ওয়াজেদ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটে আঞ্চলিক পরিচালক পদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ যখন তাকে যোগ্য ভাবছে, সায়মা ওয়াজেদের অভিজ্ঞতা যখন তার হয়ে কথা বলছে, সেখানে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে হওয়ার কারণে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানসিক দৈন্যতার প্রকাশ। আশা করছি, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের হাত ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের স্বাস্থ্যখাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটবে।
সায়মা ওয়াজেদ ডাব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত