জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা বেগম খালেদা জিয়ার পথ অনুসরণ করে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেওয়া এই প্রথম ভাষণে তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তর এবং গণতন্ত্রের এক নতুন অভিযাত্রার কথা বিশ্ববাসীর সামনে দৃঢ় কণ্ঠে তুলে ধরেন, তুলে ধরেন বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনার কথা।

শুক্রবার রাত ৪টা ১৮ মিনিটের দিকে (বাংলাদেশ সময়) তিনি ভাষণ দেয়া শুরু করেন। ভাষণের শুরুতেই তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো লাখো বীর শহীদ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদ এবং আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মারণাস্ত্র কিংবা যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, বরং যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাকেই পরিবর্তনের মূল হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। জাতিসংঘকে শান্তি ও সমঝোতামূলক বিশ্ব প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বাংলাদেশ।

এই প্রসঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবির প্রতি বাংলাদেশের অটল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সাথে দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এই সমস্যার একমাত্র টেকসই সমাধান। তিনি এই মানবিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং একটি কার্যকর সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলকে জোরালো ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, জলবায়ু বিপর্যয়ে বাংলাদেশের দায় অত্যন্ত কম হলেও ক্ষতির বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করতে হচ্ছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার, টেকসই অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তায় আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের জোর দাবি জানান তিনি।

এ সময় দেশের পরিবেশ রক্ষায় তাঁর সরকারের নেওয়া মহাপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, বন্যা ও খরা মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।

প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর অগ্রগতি প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা 'এআই' বিভাজনে পরিণত না হয়। প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে কাজে লাগাতে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনায় জাতিসংঘের মাধ্যমে কার্যকর বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান।

পাশাপাশি, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে টেকসই করতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, বাজারসুবিধা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে একটি মানবিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনোয়োগের আমন্ত্রণ জানান। পরিশেষে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’- এই কালজয়ী বার্তার মাধ্যমে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক বক্তব্য শেষ করেন।
