বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অভিনয়ের মঞ্চ, ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষকতার পর একসময় সক্রিয় রাজনীতিতে পা রাখেন তিনি। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় রাজপথের আন্দোলন থেকে জাতীয় নেতৃত্ব—সবখানেই রেখেছেন নিজের উপস্থিতি।
১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব শুরু করেন মির্জা ফখরুল। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ২০২৬ সালে এসে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম মির্জা ফখরুলের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।

সরকারি চাকরির সময় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮২ সালে এস এ বারীর পদত্যাগের আগ পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন মির্জা ফখরুল।
ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা রাহাত আরা একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শেষে অবসরে যান।

এই দম্পতির দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং সেখানে শিক্ষকতাও করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে রয়েছেন। ছোট মেয়ে সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বর্তমানে ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পথচলার শুরু ছাত্রজীবনেই। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী থাকাকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের মহাসচিব এবং সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি একাধিকবার গ্রেপ্তারও হন।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। দুই বছর পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৯২ সালে দায়িত্ব পান ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির।
জাতীয় রাজনীতিতে তার উত্থান আরও দৃশ্যমান হয় ২০০১ সালের নির্বাচনে। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে একই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এরপর ২০১১ সালের ২০ মার্চ দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। পাঁচ বছর পর, ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এসে চলতি ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এরপর তারেক রহমান সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হলো নতুন অধ্যায়।
নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে বিরোধীদলীয় নেতার অভিনন্দন
নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে লাল গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন প্রধানমন্ত্রী