শারদীয় দুর্গোৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আরাধনার অন্তিম তিথি ‘মহানবমী’ উদযাপিত হলো পরম ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উলুধ্বনি আর আনন্দ-বেদনার মিশ্র আমেজে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকার প্রধান প্রধান পূজামণ্ডপগুলোতে ভক্তদের ভিড় জমে ওঠে।
পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, ঢাকের তীক্ষ্ণ বাদ্য, কাঁসর ঘণ্টার ধ্বনি আর ধূপের ধোঁয়ায় চারদিক এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক আবহে ভরে ওঠে। দেবীর চরণে অঞ্জলি নিবেদন করে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বশান্তি, সংঘাতমুক্ত সমাজ এবং নিজেদের ভেতরের সব আসুরিক শক্তির বিনাশ কামনা করেন।

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সকাল সোয়া ১০টায় মহানবমীর কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ভক্তদের হাতে ফুল ও বেলপাতা তুলে দেয়ার পর বেলা সোয়া ১১টার দিকে অনুষ্ঠিত হয় আবেগঘন পুষ্পাঞ্জলি।
পূজা শেষে ভক্তরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত বর্ণিল মেলায় ঘুরে বেড়ান। মেলায় স্থান পাওয়া খেলনা, চুড়ি, সাজসজ্জা ও গৃহস্থালি সামগ্রী কেনার আনন্দে মাতেন ছোট-বড় সবাই।

ধানমন্ডি থেকে ঢাকেশ্বরীতে আসা সরকারি কর্মকর্তা অজিত দেব পরিবার নিয়ে অঞ্জলি দেওয়ার পর আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, সন্তানদের ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এটি একটি দারুণ সুযোগ। তিনি প্রার্থনায় সবার জন্য কল্যাণ এবং ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মিলেমিশে থাকার আকুতি জানান।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উপদেষ্টা অরূপরতন চৌধুরী জানান, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় এবার মহালয়া থেকে শুরু করে ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী অত্যন্ত সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, মানবজাতির ভেতরের অশুভ প্রবৃত্তি ও হিংসা দূর করাই মহানবমীর মূল বার্তা।

একই সুর ধ্বনিত হয়েছে সিদ্ধেশ্বরী কালী মণ্ডপেও। সেখানে পরম ভক্তি ও বিহিত পূজার পাশাপাশি মহাসমারোহে সম্পন্ন হয় মহানবমীর মূল আকর্ষণ 'মহা হোম' বা যজ্ঞ। সকাল থেকেই উপবাস থেকে ভক্তরা দেবী দুর্গার নবম রূপ ‘মা সিদ্ধিদাত্রী’র আরাধনা করেন।
সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির পরিষদের পুরোহিত শ্রী চন্দন চক্রবর্তী বলেন, কলিযুগে মানুষের আসল শত্রু বাইরের কেউ নয়, বরং অন্তরের কু-রিপু ও আসুরিক ভাব। আজকের এই বৈশ্বিক হানাহানির যুগে মায়ের কাছে প্রধান প্রার্থনাই হলো মানুষের অন্তরের সেই আসুরিক স্বভাব বিনাশ করে শুভশক্তির জাগরণ ঘটানো।

উৎসবের এই চূড়ায় দাঁড়িয়েও প্রতিটি মণ্ডপে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিষাদের ছায়া। কারণ, মহানবমীর রেশ কাটার পরপরই কাল বুধবার আসবে বিজয়া দশমী- যেদিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মর্ত্যলোক ছেড়ে কৈলাসে ফিরে যাবেন দেবী দুর্গা। সিদ্ধেশ্বরী মন্দির কমিটির যুগ্ম সম্পাদক দিব্যেন্দু শেখর অর্ঘ্য জানান, বুধবার দুপুরে ওয়াইজঘাটে বিসর্জনের মাধ্যমে ছয় দিনব্যাপী এই আনন্দ-উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
পঞ্জিকামতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘটেছিল ঘোটকে (ঘোড়ায়) চড়ে এবং তিনি ফিরে যাবেন নৌকায়। সন্ধ্যায় মণ্ডপে মণ্ডপে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী ধুনুচি নাচ আর আরতির মধ্য দিয়েই শেষ হলো মহানবমীর রাত। এখন শুধুই অপেক্ষা বিজয়া দশমীতে দেবীকে অশ্রুসিক্ত বিদায় জানানোর।
