হ্যাপিনেস ইন্টেলিজেন্স: অস্থিরতার মাঝে শান্তির আলো

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০৬:৫২ পিএম

​আজকের পৃথিবী এক প্রলম্বিত, অদৃশ্য ঝড়ের মধ্যে হেঁটে চলা মানুষের উপাখ্যান। চারপাশে রাজনৈতিক মেরূকরণ, অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব এবং লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি—সবকিছু আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে গভীর অনিশ্চয়তার আবরণে ঢেকে রেখেছে। আমরা যেন সবাই এক অলীক দৌড়ে অংশ নিচ্ছি, যেখানে লক্ষ্য কেবল এক ‘সোনার হরিণ’ – অথচ এই দৌড়ের শেষে আমাদের মনোভূমিতে জন্ম নিচ্ছে এক অস্থির শূন্যতা।

বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে ‘জিডিপি ফ্যালিউসি’ বা ‘স্থূল দেশজ উৎপাদনের ভ্রম’ -এ আক্রান্ত। এই ভ্রম আমাদের শিখিয়েছে, কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই সুখের একমাত্র মাপকাঠি। কিন্তু পরিসংখ্যান দেখায়, এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও পরিবেশ দূষণ, সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের মানসিক চাপ কেবল তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এই পটভূমিতেই আমাদের বুঝতে হবে: হ্যাপিনেস কেনা যায় না, কিন্তু শেখা যায়। হ্যাপিনেস ইন্টেলিজেন্স হলো সেই নিগূঢ় মানবিক ক্ষমতা, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সচেতনভাবে সুখ, শান্তি ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি বজায় রাখতে পারে—যা মানুষকে কেবল বাঁচিয়ে রাখে না, বরং বাঁচতে শেখায়।

সুখ কেবল মস্তিষ্কের ক্ষণিকের রাসায়নিক ঝলকানি নয়, এটি এক ধরনের মানসিক মূলধন, যা আত্মার স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের শাখা ‘পজিটিভ সাইকোলজি’ এই দর্শনেরই বিজ্ঞানসম্মত রূপায়ন। মনস্তত্ত্বের গভীরতম গবেষণার ফলস্বরূপ আমরা জানি, জীবনের গুণগত মান নির্ভর করে মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিকসেন্টমিহাই-এর ‘ফ্লো’ (ফ্লো স্টেট) -এর মতো অভিজ্ঞতা অর্জনের ওপর—যখন কাজের সাথে দক্ষতা মিলে গিয়ে মানুষ চরম নিমগ্নতা খুঁজে পায়।

হ্যাপিনেসে শেখা যায়—এই বৈজ্ঞানিক যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করে ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ -এর ধারণা। অর্থাৎ, সচেতন চর্চা, যেমন নিয়মিত মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন, আমাদের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতাকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে। যখন আমরা কৃতজ্ঞতা অনুশীলন করি, তখন ড. রবার্ট এ. এ্যামন্সের গবেষণা অনুযায়ী, এটি সরাসরি মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স-কে উদ্দীপিত করে এবং শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, যা প্রমাণ করে সুখ হলো জীবনের ‘অনুশীলনযোগ্য এক শৈল্পিক কলা’।

বিশ্বজুড়ে সুখের মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৪-এর তথ্য। এই বছর ফিনল্যান্ড (৭.৭৪১ স্কোর) সপ্তমবারের মতো শীর্ষে, যা প্রমাণ করে সুখের উৎস জিডিপির প্রাচুর্যের মধ্যে নয়, বরং সামাজিক মূলধন এ নিহিত।

হার্ভার্ড অধ্যাপক রবার্ট পুটনাম-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, ফিনল্যান্ডের এই সাফল্য তার উচ্চ সামাজিক আস্থা, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা জাল এবং নাগরিকদের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতা-র ফল। এর বিপরীতে, উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর উচ্চ আত্মহত্যার হার প্রমাণ করে, কেবল স্থূল অর্থনৈতিক বৃদ্ধিই সুখ নিশ্চিত করতে পারে না। এই সংকট উত্তরণে ভুটান সরকার দীর্ঘদিন ধরে গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস -কে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে, যা রাষ্ট্রীয় নীতিতে মানসিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এক বৈপ্লবিক চিন্তাকে প্রতিষ্ঠা করেছে।

​বাংলাদেশের সুখ সূচকের বিশ্লেষণ এক জটিল এবং গভীর উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১৪৩টি দেশের মধ্যে ১২৯তম অবস্থানে নেমে এসেছে, যা দেশের জন্য গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই অবনতির পেছনে অন্যতম কারণ হলো সামাজিক সংযোগের দুর্বলতা; রিপোর্ট বলছে, দেশের মানুষের মধ্যে মাত্র ৪৪.৮ শতাংশ মনে করেন যে বিপদের সময় তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ আছে। এই আস্থার সংকট আমাদের সামাজিক বন্ধনের ভঙ্গুরতাকে নির্দেশ করে। তবে, এই হতাশাজনক চিত্রের মধ্যেও এক দার্শনিক বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান: ৩০ বছরের কম বয়সি তরুণরা সবচেয়ে বেশি সুখী এবং সবচেয়ে কম সুখী হলো ৪৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি মধ্যবয়সীরা। এই পার্থক্য মূলত মধ্যবয়সি প্রজন্মকে গ্রাস করা ‘স্যান্ডউইচ জেনারেশন’ -এর চাপ এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মতো অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে তৈরি হয়েছে। এই সংকটটিকে আমাদের অবশ্যই আন্তঃপ্রজন্মগত ন্যায়বিচার -এর অভাব হিসেবে দেখতে হবে, যেখানে পূর্ববর্তী প্রজন্মের নীতিগত দুর্বলতা বর্তমান প্রজন্মের মানসিক চাপকে বাড়িয়ে তুলেছে।

​এই পরিস্থিতিতে হ্যাপিনেস ইন্টেলিজেন্স চর্চার জন্য একটি সামগ্রিক, সমন্বিত সমাধান জরুরি। আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থায় এখন ‘সোশ্যাল অ্যান্ড ইমোশনাল লার্নিং’ -এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতাকে পাঠ্যক্রমের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ‘ইউডাইমোনিয়া’ বা ‘বিকশিত জীবন’ -এর ধারণাকে শিক্ষার মূলে প্রতিষ্ঠা করা উচিত। সেই সঙ্গে ইমানুয়েল কান্টের ‘ক্যাটেগরিক্যাল ইম্পারেটিভ’-এর মতো নৈতিক দর্শনকে যুক্ত করে শিক্ষার্থীকে কেবল নিয়মের অনুগত না রেখে, বিবেকের স্বাধীনতা এবং নৈতিক দায়িত্ববোধের জন্ম দেওয়া জরুরি। আধুনিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন গুগল ও অ্যামাজন, কর্মীদের মানসিক প্রশান্তির জন্য ‘মাইন্ডফুলনেস বিরতি’-র মতো কর্মসূচি চালু করেছে।

​সুতরাং, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিগত ও কাঠামোগত পদক্ষেপ। যদিও বাংলাদেশে ‘ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ২০২০-২০৩০’ বিদ্যমান, কিন্তু সেখানে প্রাথমিক প্রতিরোধ এবং মানসিক কল্যাণকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সমান্তরাল নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অভাব রয়েছে। এই অভাব পূরণে রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

এই বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রকে অবশ্যই এমন দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করতে হবে যা মধ্যবয়সি এবং বয়স্কদের অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ কমায়, আন্তঃপ্রজন্মগত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। একইসাথে, জাতীয় শিক্ষা নীতিতে হ্যাপিনেস ইন্টেলিজেন্স ও মাইন্ডফুলনেসকে শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়া, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে যুবসমাজের আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে একটি ‘জাতীয় সংহতি কর্মসূচি’ প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে সাইকো-সোশ্যাল সাপোর্টকে সর্বজনীন করার লক্ষ্য থাকবে।

​অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানের উচিত কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্বের (সিএসআর) আওতায় মানসিক স্বাস্থ্য ও হ্যাপিনেস প্রশিক্ষণের জন্য বাজেট নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে ‘মানসিক স্বাস্থ্য বিরতি’ বাধ্যতামূলক করার আইনি পদক্ষেপ নেওয়া। পাশাপাশি, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মনোবিজ্ঞান বিভাগকে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের ‘ওয়েল-বিং অডিট’ পরিচালনার জন্য চুক্তিবদ্ধ করা উচিত, যাতে কর্মক্ষেত্রের সমাধানগুলো কেবল অনুমান নির্ভর না হয়ে ডেটা-চালিত হয়। প্রতিষ্ঠানের উচিত কাজের পরিবেশকে কেবল ফলনমুখী না করে, 'জীবনমুখী' করার জন্য ভার্চুয়াল যোগাযোগের কঠোর সীমানা তৈরি করা, যাতে কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবন প্রযুক্তির সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে রক্ষা পায়।

​এবং এই সমস্ত কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করবে আমাদের সমাজ। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে, প্রতিটি পরিবারে দিনের শুরুতে বা শেষে কমপক্ষে দশ মিনিটের ‘কৃতজ্ঞতা ডায়েরি’ লেখার অভ্যাস চালু করা জরুরি। শিশুদের ওপর কেবল জিপিএ নির্ভর চাপ কমিয়ে তাদের ব্যক্তিগত প্রতিভা ও মানবিক বিকাশে মনোযোগী হতে হবে। সমাজে শিক্ষকদের প্রতি কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক সম্মান পুনরুদ্ধার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

তরুণদের উচিত স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করে নিজেদের কমিউনিটিতে সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রাথমিক আলোচনা এবং পিয়ার সাপোর্ট প্রদান করা। প্রতিটি ব্যক্তিকে প্রযুক্তির যুগে নিজেদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের সীমানা দৃঢ়ভাবে চিহ্নিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় ‘মাল্টিটাস্কিং’ এড়িয়ে ‘একক-কাজে মনোযোগ’ ফিরিয়ে আনা আবশ্যক।

এই সম্মিলিত ব্যক্তিগত, সামাজিক ও কাঠামোগত উদ্যোগের মাধ্যমেই সংস্কার সম্ভব। অমর্ত্য সেন যেমন বলেছেন, শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত ‘কার্যকারিতা’ কেবল অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নয়, বরং ‘রাজনৈতিক স্বাধীনতা’ এবং ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য। হ্যাপিনেস ইন্টেলিজেন্সের এই দর্শনই আমাদের সমাজকে আরও মানবিক, সংহত ও সমৃদ্ধ করার পথ দেখায়—এটি কেবল একটি ব্যবস্থা নয়, এটি মানবমুক্তির এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্টার/ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়/[email protected]

একাত্তর/আরএ
বিজ্ঞান ও গবেষণার  মাধ্যমে রাষ্ট্রের উন্নয়ন আজকের দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা রাষ্ট্রের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান...
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে এই কার্ডের...
একটি দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণই কেড়ে নেয় না, বদলে দেয় অসংখ্য মানুষের জীবন। রেখে যায় এমন কিছু ক্ষত, যা হৃদয়ের গভীরে রয়ে যায়। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার পর...
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে বদিউর রহমান এবং নির্বাহী কমিটির (ইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে সেলিম রহমান নির্বাচিত হয়েছেন। 
রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন শুধু মুখে বলার বিষয় নয়, বরং তা কাজে করে দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—এমন মন্তব্য করেছেন তার প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। তিনি বলেন, দেশের মানুষের মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর