শতবর্ষে ভাষা সংগ্রামী মতিন: অবিচল প্রত্যয় ও প্রতিশ্রুতির পাঠ

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৩৬ পিএম

মহাকালের বিস্তৃত পটভূমিতে কিছু কিছু জীবন কেবল ইতিহাস নয়, হয়ে ওঠে সময়ের আয়না। সেই আয়নায় প্রতিফলিত হয় একটি জাতির স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আপসহীন আত্মপরিচয়ের দর্শন। আজ তিন ডিসেম্বর, সেই রকমই এক কালপুরুষের জন্মশতবার্ষিকী—আব্দুল মতিন। সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে উঠে আসা এই বিরল ব্যক্তিত্ব আমাদের কাছে পরিচিত 'ভাষা সংগ্রামী মতিন' নামে, যাঁর জীবন আমাদের জাতীয় চেতনার ভূগোল নির্মাণ করেছে। ভাষা সংগ্রামী মতিনের জীবন যেন এক প্রবহমান নদীর মতো; যার উৎস ছিল ভাষার অধিকার, কিন্তু তার গন্তব্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বজুড়ে চলমান ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের এক প্রদীপ্ত স্থানীয় প্রকাশ।

​তবে ইতিহাসের এই মুক্তির পথ কখনোই সুগম ছিল না। তার জন্য প্রয়োজন ছিল চেতনার গভীরে এক নির্ভীক তারুণ্যের বিদ্রোহ, যা বায়ান্নর উত্তাল দিনে জন্ম নিয়েছিল আব্দুল মতিনের হাত ধরেই। আব্দুল মতিনের জীবনে সবচেয়ে দীপ্তিময় অধ্যায়টি নিশ্চিতভাবেই ১৯৫২ সালের মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে তিনি কেবল সেই আন্দোলনের সংগঠক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এর সিদ্ধান্ত-প্রণেতা এবং দুঃসাহসের প্রতীক। ২০ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন ১৪৪ ধারা জারি করে সকল প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে দিতে চাইল, তখন ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনের ঐতিহাসিক আমতলায় অনিশ্চয়তার দোলাচলে দাঁড়িয়ে তাঁর সভাপতিত্বেই গৃহীত হয় সেই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত—১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত। এটি ছিল কেবল একটি ছাত্র-সংগ্রাম নয়, বরং উপনিবেশিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রথম বজ্রকণ্ঠ। গবেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মতিন প্রমাণ করেছিলেন যে, নেতৃত্বের সাহস ও প্রজ্ঞা থাকলে সাধারণ ছাত্র-জনতার শক্তি দিয়েই ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। বাঙালির ইতিহাসে এটি ছিল এক অনিবার্য বাঁকবদল।

​​ভাষাগত অধিকারের এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর আব্দুল মতিন বুঝতে পেরেছিলেন, সংগ্রাম কেবল বর্ণমালায় থামতে পারে না। তাই মুক্তির সেই আগুনের শিখাকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সম্প্রসারিত করলেন বৃহত্তর অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল সংগ্রামের পথে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে রাষ্ট্রভাষা দিয়ে আত্মপরিচয় রক্ষা করা হয়, সেই রাষ্ট্রকাঠামোয় যদি মানুষই শোষিত হয়, তবে সে মুক্তি অর্থহীন। তাই ভাষা সংগ্রামী মতিন কেবল একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধ জয় করেই ক্ষান্ত হননি; সংস্কৃতির এই জাগরণকে তিনি অর্থনীতির ন্যায়ের পথে চালিত করতে চেয়েছিলেন—যেখানে শ্রেণী বৈষম্যের দেওয়াল ভাঙা অনিবার্য ছিল। এই গভীর উপলব্ধির ফলস্বরূপ ১৯৫২ সালের অব্যবহিত পরেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রসারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন গঠনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং একসময় এর সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। তিনি আমৃত্যু এই সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতি অবিচল ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থেকে শুরু করে ন্যাপ এবং পরবর্তীতে ওয়ার্কার্স পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর পথচলা প্রমাণ করে, তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল শ্রেণি সংগ্রাম ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্রত। দীর্ঘ প্রায় দশ বছরের কারাজীবন এবং লোভের ঊর্ধ্বে থাকার মানসিকতা প্রমাণ করে, তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, কোনো লাভজনক পেশা নয়।

​বস্তুত, আব্দুল মতিনের সংগ্রামকে কেবল মাতৃভাষার দাবি হিসেবে দেখলে তার বিশালতা অনুধাবন করা যায় না; তা ছিল ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক গভীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ। ভাষা আন্দোলনের সফলতাই বাঙালি তরুণ সমাজের মনে পাকিস্তানি শাসনের অসারতা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে গভীরভাবে প্রোথিত করে। আব্দুল মতিন সেই আকাঙ্ক্ষার অন্যতম প্রধান প্রেরণা। তাঁর জীবন এতটাই আদর্শনিষ্ঠ ছিল যে, ২০০১ সালে একুশে পদক পেলেও তিনি রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহের ঊর্ধ্বে থেকেছেন। এমনকি, তাঁর প্রয়াণের পরেও (মৃত্যু: ০৮ অক্টোবর ২০১৪) তিনি মরণোত্তর চক্ষু ও দেহদান করে মানবকল্যাণে এক অনন্য নজির স্থাপন করে গিয়েছেন, যা তাঁর আদর্শিক দৃঢ়তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। মতিনের এই ত্যাগ ও নিস্পৃহতা বর্তমান সময়ের নৈতিক দেউলিয়াত্বে ভোগা ও ক্ষমতা-কেন্দ্রিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এক কঠিন প্রশ্নচিহ্ন স্থাপন করে। তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব প্রমাণ করে গিয়েছেন যে, রাজনীতির আসল মঞ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং তা হলো আত্মমর্যাদার সেই কঠিন ভূমি, যেখানে ত্যাগই একমাত্র মুদ্রা। তাঁর এই আদর্শিক দৃঢ়তা নতুন প্রজন্মের কাছে এক মহৎ উদাহরণ।

​আব্দুল মতিন কোনো ব্যক্তি নন, তিনি আমাদের জাতীয় চেতনার অমর ভাস্কর্য। আজ তাঁর জন্মশতবার্ষিকীর এই পূণ্যক্ষণে আমরা তাঁকে পাঠ করছি আদর্শের এক নিরন্তর পাঠশালা হিসেবে। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়ে গিয়েছে —অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার সাহসই হলো প্রকৃত মুক্তির পথ। এই মহান সংগ্রামীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের একমাত্র সার্থকতা হলো: তাঁর দেখানো পথে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে একটি শোষণমুক্ত, প্রগতিশীল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়া। তাঁর কীর্তি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক ধ্রুবতারা হয়ে চিরকাল প্রেরণা যোগাবে। কারণ আব্দুল মতিন ছিলেন সেই অনিবার্য চির-প্রবহমান ধারা, যিনি কেবল পথ দেখাননি; বাঙালির জন্য পথ তৈরি করে গিয়েছেন।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্টার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, [email protected]

একাত্তর/এসি
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে এই কার্ডের...
একটি দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণই কেড়ে নেয় না, বদলে দেয় অসংখ্য মানুষের জীবন। রেখে যায় এমন কিছু ক্ষত, যা হৃদয়ের গভীরে রয়ে যায়। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার পর...
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে বদিউর রহমান এবং নির্বাহী কমিটির (ইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে সেলিম রহমান নির্বাচিত হয়েছেন। 
রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন শুধু মুখে বলার বিষয় নয়, বরং তা কাজে করে দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—এমন মন্তব্য করেছেন তার প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। তিনি বলেন, দেশের মানুষের মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর