লিবিয়ার পথে বাংলাদেশিদের মৃত্যুফাঁদ, তবু থামছে না ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম

উন্নত জীবনের স্বপ্ন, পরিবারের আর্থিক সংকট এবং ইউরোপে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা। এই তিন কারণেই প্রতি বছর হাজারো বাংলাদেশি দালালচক্রের মাধ্যমে লিবিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ অনেকের জন্য পরিণত হচ্ছে নির্যাতন, অপহরণ, মুক্তিপণ, কারাবাস, এমনকি মৃত্যুর ফাঁদে। গত দুই বছরে বাংলাদেশ সরকার, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে একাধিক দফায় ১৫০, ১৭৫, ১৭৬, ১৭০ এবং ৩০৯ জন বাংলাদেশিকে লিবিয়া থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ২০২৬ সালেও এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং এপ্রিল মাসে আরও ১৭৫ জন দেশে ফেরেন। প্রত্যাবাসিতদের অধিকাংশই অনিয়মিতভাবে লিবিয়ায় অবস্থান করছিলেন এবং মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনে সেখানে গিয়েছিলেন। সর্বশেষ আরো ১৭৩ জন বাংলাদেশিকে ফেরত নিয়েছে বাংলাদেশ।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ বাংলাদেশির মূল লক্ষ্য লিবিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস নয়। তারা প্রথমে লিবিয়ায় পৌঁছে পরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি বা অন্য ইউরোপীয় দেশে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এই যাত্রার জন্য দালালচক্রের কাছে একজনকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। অনেক পরিবার জমি বিক্রি বা ঋণ নিয়ে এই অর্থের ব্যবস্থা করে।

প্রত্যাবাসিত বাংলাদেশিদের বক্তব্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেকের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। তাদের অপহরণ করে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। কেউ কেউ মাসের পর মাস সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে আটকে থাকেন। অনেককে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হয় এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। 
লিবিয়া থেকে ইউরোপ যাওয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হলো ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া। পুরোনো কাঠের নৌকা বা রাবারের ডিঙিতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে সমুদ্রে নামানো হয় অভিবাসীদের। মাঝপথে নৌকাডুবি, ঝড় কিংবা ইঞ্জিন বিকল হয়ে বহু মানুষ প্রাণ হারান।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট এখনও বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসন পথগুলোর একটি। প্রতিবছর শত শত, কখনও এক হাজারের বেশি অভিবাসী এ পথে নিহত বা নিখোঁজ হন। তবে নিহতদের জাতীয়তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শনাক্ত করা যায় না। ফলে গত দুই বছরে কতজন বাংলাদেশি এই পথে প্রাণ হারিয়েছেন, তার নির্ভুল সরকারি পরিসংখ্যান নেই। 

তবে এক পরিসংখ্যানে ২০২৩ সালে প্রতি দিন গড়ে ৮.৭ জন এবং ২০২৪ সালে ৬.৭ জন ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশী সাগরে প্রাণ হারান।

বাংলাদেশ সরকার, আইওএম কিংবা জাতিসংঘ কেউই বাংলাদেশিদের মৃত্যুর পৃথক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। কারণ অনেক নৌকাডুবিতে মরদেহ উদ্ধার হয় না, আবার উদ্ধার হলেও পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অনেক ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের আর কখনও খুঁজে পাওয়া যায় না।

তবে প্রত্যাবাসিতদের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়েছে, লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার অনিয়মিত পথ এখন বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন রুট।

লিবিয়া হয়ে ইউরোপে আসা অনেকের মতে বাংলাদেশ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি মানবপাচার নেটওয়ার্ক এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। গ্রামের দালালরা বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষ সংগ্রহ করে। পরে তাদের লিবিয়ায় পাঠিয়ে ইউরোপে নেওয়ার নামে আরও অর্থ আদায় করা হয়।

বাংলাদেশ সরকার, লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা যৌথভাবে নিয়মিত প্রত্যাবাসন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশে ফেরার পর প্রত্যাবাসিতদের নগদ সহায়তা, খাদ্য, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনে অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে সরকার অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়ায় অনেকটা কমেছে এই ঝুঁকি পূর্ণ পথের যাত্রী।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দেশে ফিরিয়ে আনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, বৈধ শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিদেশগামী কর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশে কর্মসংস্থান তৈরি না হলে ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিবাসন বন্ধ করা কঠিন হবে।

তাদের মতে, যতদিন উন্নত জীবনের আশায় মানুষ দালালদের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করবে, ততদিন লিবিয়ার মরুভূমি ও ভূমধ্যসাগর বাংলাদেশিদের জন্য একটি নীরব মৃত্যুফাঁদ হয়েই থাকবে।

আরবিএস
ডেঙ্গু মহামারি রূপ নেওয়ার আশঙ্কা থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে শিক্ষার্থী, তরুণ সমাজসহ দেশের প্রতিটি নাগরিককে সম্মিলিতভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে এগিয়ে আসার আহ্বান...
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী সৈকত সংলগ্ন পাটোয়ারটেক এলাকায় মেরিন ড্রাইভ সড়ক ঘেঁষা কাঠের তৈরি একটি রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় এক ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত কমপক্ষে ছয়জন...
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজধানীর যন্তর মন্তরে প্রবেশ ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দুই শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে দিল্লির কুখ্যাত তিহার জেলের...
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস প্রেস সচিব কেটি জ্যাকারিয়া দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় শুক্রবার তাঁর পদ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। রয়টার্সের বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করা...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর