অপরাধ এবং বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো অপরাধীকে সুরক্ষা বা অনুকম্পা দেয়া হবে না। তিনি বলেন, অপরাধী কেবলই অপরাধী। রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সিলেট সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে সিলেটের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন সংক্রান্ত এক মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সিলেট জেলা প্রশাসন এ সভার আয়োজন করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, রাজনৈতিক পটভূমি যাই হোক না কেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।
তিনি সিলেটের স্থানীয় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও চোরাচালানিদের একটি ‘সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ’ তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন প্রশাসনকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক কারণে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হেনস্তার শিকার না হন, আবার দলীয় পরিচয়ের কারণে কোনো প্রকৃত অপরাধী যেন পার পেয়ে না যায়।
আগামী এক মাসের মধ্যে এই নির্দেশনার দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রদর্শনে দায়িত্বপ্রাপ্তদের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, আমরা পুলিশ বাহিনীতে ‘রিওয়ার্ড ও পানিশমেন্ট নীতি চালু করেছি।
তিনি সিলেট রেঞ্জ পুলিশ ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশে (এসএমপি) প্রবর্তিত ‘রিওয়ার্ড ও পানিশমেন্ট নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন পরবর্তী দায়ের করা মামলাগুলো পুনর্নিরীক্ষার নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি উল্লেখ করেন, কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারের পরিবর্তে তৃতীয় কোনো পক্ষ মামলা করেছে-যা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি, ব্যবসায়ীদের হয়রানি বা অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের চর্চার কারণে আন্দোলনের প্রকৃত ভুক্তভোগী ও শহীদদের পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নিহতের পরিবার মামলা করার সুযোগই পায়নি; অথচ অন্য এক রাজনৈতিক ব্যক্তি প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করে মামলা ঠুকে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত অপরাধীদের সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব ছিল।
তাই সিলেট রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন এলাকার সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দেন মন্ত্রী। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী অহেতুক হয়রানির শিকার ও নির্দোষ ব্যক্তিদের আসামির তালিকা থেকে অব্যাহতির (অব্যাহতি প্রদান) নির্দেশ দেন তিনি।
একই সাথে মামলা পুনর্নিরীক্ষাকালে যেকোনো ধরনের তদবির, আর্থিক লেনদেন বা অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ থেকে বিরত থাকার কঠোর হুঁশিয়ারি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো অবস্থাতেই যেন প্রকৃত অপরাধী ও হুকুমদাতারা রেহাই না পায়।
সিলেটে বালু ও পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় তৈরি হওয়া পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তার নেতৃত্বে ইতোমধ্যে একটি জাতীয় কমিটি কাজ করছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আদালতের নির্দেশনা সমন্বয় করে প্রস্তুতকৃত কার্যবিবরণী অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি এ সংক্রান্ত আদালতের মামলার দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সাথে সমন্বয় রেখে দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ি ঢলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও পরিবেশের ক্ষতি রোধে মনিটরিং টিমের মাধ্যমে সার্বিক তদারকি জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
‘মব’ বা অরাজকতা সৃষ্টির অপসংস্কৃতি সরকার কোনোভাবেই সহ্য করবে না উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দাবি আদায়ের নামে সড়ক অবরোধ বা ঘেরাও না করে প্রচলিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্মারকলিপি প্রদান বা প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে বিষয়টি উপস্থাপন করতে হবে। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে মবের ঘটনা ৫০ শতাংশের বেশি কমে এসেছে জানিয়ে তিনি সিলেট অঞ্চলকেও সম্পূর্ণ মবমুক্ত রাখার আহ্বান জানান।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সিলেটকে মাদকমুক্ত করতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স প্রদর্শন করতে হবে।
তিনি বলেন, মাদকের সাধারণ সেবনকারীদের পেছনে না ছুটে শীর্ষ অন্তত ৫০ জন মাদক কারবারির একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুত করে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের ভৌগোলিক আয়তনে সর্ববৃহৎ মেট্রোপলিটন পুলিশ এলাকা হিসেবে এসএমপির লজিস্টিক সংকট দূরীকরণ, নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং পর্যাপ্ত পুলিশি যানবাহন সরবরাহ করতে হবে।
এ বিষয়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন। তিনি সাধারণ মানুষের উত্তরোত্তর আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে প্রতিটি পুলিশ ইউনিটকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন-সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মালেক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান ও বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।
এ সময় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন, পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকী সাহা।
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের অপরাধ দমনে পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করা এবং অপরাধীদের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দিক-নির্দেশনা দেন।
বিএনপির বিদ্রোহীরা কি দলে ফিরছেন? যা জানালেন রাশেদ খান
বহুদলীয় ও সংসদীয় গণতন্ত্র বিএনপির হাত ধরেই এসেছে: প্রধানমন্ত্রী
নানামুখী ষড়যন্ত্র করেও বিএনপিকে ব্যর্থ করা যাবে না: রুহুল কবির রিজভী
শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম ও ভীতির সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়: স্পিকার