ভারতের সাথে বাংলাদেশের ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তিকে বিএনপি সবসময় ‘গোলামি চুক্তি’ বলে এসেছে। ১৯৯২ সালে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে তিনদিনের সরকারি সফরে ভারতে যান। দেশে ফেরার পর সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেন- ম্যাডাম, আপনি কি ২৫ বছরের চুক্তি বাতিলের ব্যাপারে কোনো আলোচনা করেছেন? খালেদা জিয়া জবাব দেন- ‘আল্লাহ আমি তো ওটা ভুলেই গিয়েছিলাম।’
২৯ মে দৈনিক ইত্তেফাক সাধু ভাষায় লেখে, এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, ২৫ বছরের চুক্তি পর্যালোচনার ব্যাপারে কোনো আলোচনা হয় নাই। এমনকি বিষয়টি তাহার মনেও ছিলও না। বিএনপির রাজনীতির ভিত্তি যে তথাকথিত ‘গোলামী চুক্তি’ সেই বিষয়টিই বিএনপি চেয়ারপার্সন ভুলে গিয়েছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে বিএনপির ভারত বিরোধিতা কেবল মুখে মুখে। বিরোধিতার রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ ক্ষমতায় থাকার সময় বিএনপিই সবচেয়ে বেশি ভারতের তাঁবেদারি করেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় ভারতের কাছ থেকে দেশের ন্যায্য অধিকার আদায় করেছে।
ভারতের সাথে আলোচনার মাধ্যমে গঙ্গার পানি চুক্তি, ছিটমহলে বিনিময়, ভারতের কাছ থেকে বিশাল সমুদ্রসীমা আদায় সহ অসংখ্য সমস্যার সমাধান হয়েছে আওয়ামী লীগের সময়ে।
ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্য-অর্থনীতি
বাংলাদেশ আমদানি নির্ভর দেশ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঘাটতি খুবই স্বাভাবিক বিষয়। একই চিত্র ভারতের ক্ষেত্রেও। ভারতের সাথে আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে বৈষম্য অনেক বেশি।
কিন্তু বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে পার্থক্য হলো, বিএনপি আমলে শুধু আমদানিই হয়েছে, রপ্তানি হয়নি বললেই চলে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সময়ে আমদানির পাশাপাশি রপ্তানিও বেড়েছে অনেক।
বিএনপির ১৯৯৫ সালে ভারত যতো টাকার পণ্য আমদানি হয়েছে তার মাত্র ১২ ভাগের একভাগ রপ্তানি হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ২০০০ সালে এটা আট ভাগে কমে এসেছে। আওয়ামী লীগের সময়ে রপ্তানি বেড়েছে, আমদানি কমেছে।
অংকের হিসেবে ১৯৯৫ সালে ১.০৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, আর রপ্তানি হয়েছে ৮৫ মিলিয়ন ডলারের। অন্যদিকে ২০০০ সালে ৭৭৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, আর রপ্তানি হয়েছে ৮৮.৭ মিলিয়ন ডলারের।
একইভাবে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় আমলে ২০০৫ সালে আমদানি হয়েছে ১.৭২ বিলিয়ন ডলারের, আর রপ্তানি হয়েছে ১০৪ মিলিয়ন ডলারের। অর্থাৎ আমদানির ১৭ ভাগের একভাগ মাত্র রপ্তানি। আওয়ামী লীগের সময়ে বাণিজ্য বৈষম্য যেখানে কমিয়ে আনা হয়েছিল, সেটা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ ২০২২-এর চিত্রেও দেখা যায়, ভারতে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর বিপরীতে প্রায় ৬ গুণ আমদানি হয়েছে, যা বিএনপি আমলে ছিল ১৭ গুণ। অর্থাৎ খালেদা জিয়ার সময়ের থেকে বাণিজ্য ঘাটতি তিনভাগের একভাগে কমিয়ে এনেছেন শেখ হাসিনা।
ভারতীয় পণ্য বর্জনে আসলে কার লাভ?
ইন্ডিয়া আউট ক্যাম্পেইনে চার ধরনের ভারতীয় পণ্য বর্জন করার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো- ১. ফাস্ট মুভিং কনজুমার্স গুডস, যেমন- তেল, নুন, চিনি, পেঁয়াজ ইত্যাদি। ২. ভারতীয় সান ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি। ৩. এয়ারটেল সিম। ৪. ভারতীয় ওটিটি চ্যানেল যেমন- হইচই, আড্ডাটাইমস, ক্লিক।
এর মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যে কোনো প্রভাবই পড়বে না। কারণ এসব পণ্যের আর্থিক মূল্য বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের মাত্র এক শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে সম্পর্কের যদি ক্ষতি হয়, তবে বিপদে পড়বে বাংলাদেশের গার্মেন্টসসহ সব ধরনের শিল্প। ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের ৮০ শতাংশেরও বেশি কাঁচামাল, বাকি ২০ ভাগের বেশিরভাগই যন্ত্রাংশ। আমদানি পণ্যের মধ্যে ভোগ্যপণ্য এক থেকে দুই শতাংশ।
ইন্ডিয়া আউট ক্যাম্পেইনের আসল উদ্দেশ্য

বিএনপি বারবার বলছে, ভারত এ সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। ইন্ডিয়া আউট ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা হবে। বিশ্ব ভূরাজনৈতিক কৌশলে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারকে যারা সমর্থন দিচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন এবং রাশিয়া সহ বেশ কয়েকটি দেশ। কিন্তু বিএনপি চায়না আউট বা রাশিয়া আউট ক্যাম্পেইন করছে না।
ইন্ডিয়া আউট ক্যাম্পেইন কয়েকটি প্রোডাক্টকে বর্জন করতে বললেও প্রকৃতপক্ষে এটি একটি সাম্প্রদায়িক প্রচারণা, যা বিএনপির মূল রাজনীতি। বিএনপি এর মধ্য দিয়ে তাদের বিভাজনের রাজনীতিটাই প্রচার করছে।
এই প্রচারণার মাধ্যমে বিএনপি দেশকে বিভাজিত করতে চায়। উগ্র ও বিভাজনের রাজনীতি করে উগ্র ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর মেরূকরণ করতে চায়।
বাংলাদেশের বাজার অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করতে চায় বিএনপি। যদিও বাংলাদেশ খাদ্যসহ বেশ কিছু পণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, কিন্তু বাজার ব্যবস্থা এখনো মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে বলে অস্থিতিশীল করে তোলা সম্ভব। (যেমন- বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩৪ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়, যা বাংলাদেশের মোট চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রতি বছরই ১/২ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।)
এ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি করতে চায় বিএনপি। এক দেশে সন্ত্রাস করে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার ক্রস বর্ডার সন্ত্রাস মোকাবেলায় বাংলাদেশ-ভারত যৌথভাবে কাজ করছে। এর ফলে দুই দেশেই সন্ত্রাসবাদ কমেছে।
আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে বন্ধুহীন করতে চায় বিএনপি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মিয়ানমারসহ নানা ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত একসাথে কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তন ফোরামে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবশ্যই আন্তর্জাতিক পরিসরে ভাবমূর্তি ভাল থাকা দরকার।
বিএনপি সবসময় ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে পছন্দ করে। তাই তারা ইন্ডিয়া আউট প্রচারণার মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করে, সন্ত্রাসবাদ বাড়িয়ে আবারও দেশের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুযোগ নিতে চায়।
বিএনপি এতদিন আমেরিকাকে অবতার ভেবে এসেছে। কিন্তু আমেরিকা বিএনপিকে ক্ষমতার কোলে তুলে দিতে পারেনি। এখন চীনের হাত ধরে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে তারা। এরই মধ্যে তাদের কয়েকজন নেতা চীনের সাথে যোগাযোগ করেছেন। চীনা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলার পুতুল হয়ে নাচা ছাড়া ‘ইন্ডিয়া আউট’ ক্যাম্পেইন থেকে বিএনপির আর কোনো লাভ নেই।
কারণ- ১. বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেই ভারতের সাথে বাণিজ্য-বৈষম্য বেড়ে যায়। ২. বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেই ভারতের কাছ থেকে কোনো কিছু আদায় করা যায় না। ৩. বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেই সবচেয়ে বেশি সীমান্ত বিরোধ (হত্যা) হয়। ৪. চীন, ভারত, রাশিয়া সরকারকে সমর্থন করলেও কেবল ভারতকেই টার্গেট করেছে বিএনপি।
পাবলিক সেন্টিমেন্ট কাজে লাগাতে চায় বিএনপি
আওয়ামী লীগ বিদেশি শক্তির দিকে তাকিয়ে থাকে: হাফিজ
ভারত বয়কট নিয়ে বিএনপির নেতারা দ্বিধায়: ওবায়দুল কাদের