সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার পূর্বে এক আবেগঘন ও কঠিন রাজনৈতিক বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, বেগম জিয়ার এই অকাল মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবেন না।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজার আগে তিনি দেশনেত্রীর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন এবং তাঁর ওপর হওয়া অন্যায়ের খতিয়ান তুলে ধরেন।
এ সময় নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ২০১৮ সাল থেকে মিথ্যা মামলায় কারারুদ্ধ থাকাকালীন উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে বেগম জিয়া দারুণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, সারা দেশবাসী সাক্ষী, দেশনেত্রী পায়ে হেঁটে কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু নির্জন কারাগার থেকে তিনি বের হলেন চরম অসুস্থতা নিয়ে। পরবর্তীতে গৃহবন্দী অবস্থায় চার বছর তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ না দেওয়ার কারণেই তাঁর মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছে।

খালেদা জিয়াকে 'অনন্ত অনুপ্রেরণা' আখ্যা দিয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে ব্যক্তিগত শত্রু হিসেবে গণ্য করেছিল। এরশাদ, ১/১১ সরকার এবং সর্বশেষ হাসিনা সরকার- সবাই তাঁকে কারারুদ্ধ করেছে।
তিনি যোগ করেন, খালেদা জিয়া আধিপত্যবাদী শক্তির সামনে মাথা নত করেননি। স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং ১৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েও তাঁকে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের প্রশ্ন থেকে বিচ্যুত করা যায়নি।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, আজ দেশনেত্রী সব অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আমাদের সামনে আছেন। অন্যদিকে যারা তাঁকে জেলে পাঠিয়েছে, যারা তাঁকে গৃহহীন করেছে, তারা আজ পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তাদের মাথার ওপর ঝুলছে মৃত্যু পরোয়ানা।

বিএনপির এই বর্ষিয়ান নেতার ভাষণে বেগম জিয়ার ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো উঠে আসে।
গণতন্ত্রের মাতা: ৯ বছর এরশাদবিরোধী লড়াই শেষে ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় ফিরে তিনি 'আপসহীন দেশনেত্রী' ও 'গণতন্ত্রের মাতা' হিসেবে স্বীকৃতি পান।
নির্বাচনী রেকর্ড: নজরুল ইসলাম খান উল্লেখ করেন, প্রতিটি নির্বাচনে বেগম জিয়া যত আসনে দাঁড়িয়েছেন, সব কটিতেই জয়ী হয়েছেন। পরাজয় তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি, যা বিশ্বে বিরল।
উন্নয়ন ও জনকল্যাণ: তাঁর সময়েই বাংলাদেশ ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে পরিচিতি পায়। নারী শিক্ষায় উপবৃত্তি, ‘শিক্ষার জন্য খাদ্য’ এবং মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় তাঁর যুগান্তকারী কাজ।
মুক্তিযুদ্ধে অবদান: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দুই শিশুপুত্রসহ তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দী ছিলেন, যা এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
নজরুল ইসলাম খান তাঁর বক্তব্যের শেষে দেশনেত্রীর একটি বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করেন- দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। বাংলাদেশই হলো আমার ঠিকানা। তিনি বলেন, প্রিয় মাতৃভূমির মাটিতেই আজ তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এবং স্বামীর পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন।
বক্তব্য শেষে তিনি প্রধান উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান এবং উপস্থিত সব রাজনৈতিক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তিনি অঙ্গীকার করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথে অবিচল থাকবে।
