ফুটবলের মাঠে দাঙ্গা ও পদদলনের ঘটনা অতীতেও বহুবার ঘটেছে। ইউরোপ ও আফ্রিকার লিগ ফুটবলের বহু খেলায় ট্রাজেডি হয়ে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়ে আছে। এবার সেই তালিকায় যোগ হলো আরও একটি বড় ট্রাজেডি। যাতে প্রাণহানির সংখ্যা দুশ’ ছাড়াতে পারে।
এবারের ট্রাজেডির স্থান এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া। স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যায় দেশটির পূর্ব জাভা প্রদেশের মালাং শহরের কাঞ্জুরুহান স্টেডিয়ামে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে ফুটবল ম্যাচটি চলছিলো। মুখোমুখি হয়েছিলো পার্সেবায়া সুরাবায়া এবং আরেমা ফুটবল ক্লাব।
গ্যালানি ছিলো কানায় কানায় পূর্ণ। দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যেই খেলা শুরুর প্রথম থেকেই উত্তেজনা। আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণে বেশ জমেও উঠেছিলো খেলা। পার্সেবায়া তার ঘরের মাঠে হারিয়ে দেয় আরেমাকে। আর এরপরেই শুরু হয় ঝামেলা।

খেলা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে শত শত বিক্ষুব্ধ সমর্থক মাঠে নেমে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা কার্যত দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েন। দুই দলের সমর্থকরা একে অপরের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি এতোটাই জটিল হয়ে পড়ে যে পুলিশকেও পালিয়ে বাঁচতে হয়।
এরিমধ্যেই খেলার বিজয়ী দল পার্সেবায়ার ফুটবলাররা বিপদ বুঝে একটুও সময় নষ্ট না করে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে মাঠ ছেড়ে সাজঘরে চলে যান। কিন্তু আরেমার বেশ কয়েকজন ফুটবলার মাঠ ছাড়তে পারেননি। তাদের উপরেও হামলা হয়। এতে বেশ কয়েকজন জখমও হন।
সমস্যা বাড়ে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে শুরু করলে। কাঞ্জুরুহান স্টেডিয়ামের ভিড়ে ঠাসা গ্যালারিতে তখনই আতঙ্ক বেশি ছড়ায়। স্টেডিয়াম থেকে বেরোনোর জন্য দর্শকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে যায়। তাতেই পদপিষ্ট হয়ে এবং শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়।
সংঘর্ষ বাড়তে দেখে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে ঘটনাস্থলে জরুরিভাবে ডাকা হয়। যদিও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কোনো রকমে স্টেডিয়াম থেকে উত্তেজিত জনতাকে টেনে বের করে আনেন সেনাকর্মীরা। স্টেডিয়াম ছাড়ার পরও হিংসা অব্যাহত ছিলো।

স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়েও উত্তেজিত দর্শকরা হাঙ্গামা করতে থাকেন। এ সময় তারা ভাঙচুর চালায় এবং পুলিশের গাড়িসহ বেশ কিছু যানবাহনে আগুন দেয়। এতে মাঠের মধ্যে হতাহত মানুষদের বের করে হাসপাতালে নিতে বেগ পেতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদেরকে।
ইন্দোনেশিয়া পুলিশ বলছে, আরেমা ম্যাচে হারার পরই গ্যালারি থেকে সমর্থকরা ঝামেলা শুরু করে। মুহূর্তে তুমুল বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় ম্যাচ ঘিরে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে টিয়ার গ্যাস ছুড়তে হয়। এতে বহু দর্শক ভয় পেয়ে যান।
এরপরই হুড়মুড়িয়ে স্টেডিয়াম ছাড়ার হিড়িক পড়ে যায়। ঘটনাচক্রে একটি মাত্রই গেট ছিল যেখান থেকে দর্শকরা স্টেডিয়াম ছেড়ে বেরোতে পারতেন। আতঙ্কে দিশাহারা দর্শকরা সেই গেট দিয়ে পালাতে গিয়েই ভয়াবহ কাণ্ড ঘটে যায়।
টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়াতেও কিছু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাতে অনেকে মারা গেছেন বলে জানা যাচ্ছে। অন্যদিকে হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে একে অপরের উপর পড়ে যান অনেকে। এতে পদপিষ্ট হয়ে মারা যান সবচেয়ে বেশি মানুষ। পুলিশের ধারণা মৃতের সংখ্যা দুশ’ ছাড়াতে পারে।

মালাং রিজেন্সি হেলথ অফিসের প্রধান উইয়ান্তো উইজো জানিয়েছেন, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ, বহু মানুষ গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে। আর নিহতদের মধ্যে পুলিশের দুই সদস্যও রয়েছেন।
আরও পড়ুন: কানপুরে আলাদা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩১, আহত ২৭
পূর্ব জাভা পুলিশের প্রধান নিকো আফিন্তা বলেন, স্টেডিয়ামের ভেতরেই ৩২ জনের মৃত্যু হয়। বাকিদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে মারা যান। পরে মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে থাকে। সবশেষ পর্যন্ত ১৭৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্য ক্ষমাও চেয়েছে জাভার পুলিশ। আপাতত আগামী এক সপ্তাহ ইন্দোনেশিয়া ফুটবল লিগ বন্ধ থাকবে বলেই খবর। সে দেশের সরকারের পাশাপাশি তাদের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
একাত্তর/আরএ
