১০০ বছর পর প্যারিসে ফিরলো ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ অলিম্পিক গেমস। তাই, এই আসরের উদ্বোধনীকে স্মরণীয় করে রাখতে কমতির কিছু রাখেনি। শুধু তাই, অলিম্পিকের ইতিহাসে আগে যা হয়নি, তেমনই এক ব্যতিক্রমী উদ্বোধন আসরের আসরের সাক্ষী হলো প্রেম-ভালোবাসা আর শিল্পের শহর প্যারিস।

প্রথমবারের মতো অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হলো জলের ওপর। প্যারিসের বুক চিরে যাওয়া সিন নদীবক্ষে বসেছিলো চোখ ধাধাঁনো আর জমকালো উদ্বোধনী, যাতে মুগ্ধ গোটা বিশ্ব। মাঠের পরিবর্তে এবার ক্রীড়াবিদদের প্যারেড হলো নদীর উপরে, একেবারে অচিন্তনীয় এক ব্যতিক্রমী আয়োজন।

দুই দিন আগেই অলিম্পিকে শুরু হয়েছে ফুটবল ও রাগবির মতো জনপ্রিয় ইভেন্ট। আর, শুক্রবার স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেলে (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টা) ইতিহাস গড়া উদ্বোধনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা উঠে ৩৩তম প্যারিস অলিম্পিক গেমসের। উদ্বোধনীর সব আয়োজনেই ছিলো একরাশ মুগ্ধতা।

প্রথমবার স্টেডিয়ামের বাইরে অনুষ্ঠিত হলো ইতিহাস গড়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। আর, বৃষ্টিস্নাত প্যারিসে বর্ণিল এই আয়োজনে মাতালো গোটা রাজধানী। ফরাসিদের ১০০ বছরের অপেক্ষা পেরিয়ে, সিন নদীও যেন নতুন যৌবন পেল বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের হাজারও তারকাকে অতিথি হিসেবে বরণ করতে পেরে।

বর্ণিল নৌকায় চড়ে ব্যতিক্রমী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অংশ হলেন প্যারিস অলিম্পিকে আগত অ্যাথলেট ও কর্মকর্তারা। নজরকাড়া নৌ প্যারেডের মধ্য দিয়েই শুরু হয় প্যারিস অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতেই দেখা মিললো ফরাসি ফুটবল কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের।

মূল অলিম্পিক স্টেডিয়াম স্তাদ দো ফঁসে থেকে জিদান অলিম্পিক মশাল নিয়ে দৌড়ে পৌঁছে দেন অন্যদের হাতে। চলতে থাকে মশাল দৌড়। ধোঁয়ার মেঘের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় ফ্রান্সের পতাকা। একই সময় শুরু হয় অ্যাথলেটদের নৌ প্যারেড। প্রথমেই দেখা মেলে অলিম্পিকের জন্মভূমি গ্রিসের দলের।

এরপর দেখা যায় জাতিসংঘের শরণার্থী দল। তারপর ক্রমান্বয়ে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা আসতে থাকে বার্জে করে। তারই মাঝে মাঝে ছিল আমেরিকান পপস্টার লেডি গাগা, ফ্রেঞ্চ ভাষার এই মুহূর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী আয়া নাকামুরা, সঙ্গে তিন হাজার নৃত্যশিল্পীর মনোমুগ্ধকর পারফরম্যান্স।

৯৪টি ছোট-বড় নৌকায় করে আসেন ২১১ দেশের অ্যাথলেটরা। সিন নদীর বুকে খেলোয়াড়দের প্যারেডের সঙ্গে তীরে দু’পাশে হলো বিভিন্ন অনুষ্ঠান। কখনো গাইলেন গাগা, কখনো পরিচয় করানো হলো প্যারিসের সংস্কৃতির সঙ্গে; কিন্তু এই সব কিছু যখন ঘটছে, তখন অবিরাম বৃষ্টিতে ভিজেছে প্যারিস।

চার ঘণ্টার অনুষ্ঠানের শেষের দিকে অন্ধকার হওয়ার পর আলো জ্বালিয়ে দেয়াও হয়। তাতে এক মায়াবী ছবি তৈরি হলেও বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে যাওয়া খেলোয়াড়রা তখন বেশ ক্লান্ত। বিভিন্ন দেশের অতিথিরা এসেছিলেন অলিম্পিকের উদ্বোধনে। লম্বা অনুষ্ঠান শেষে তাদের মুখেও তখন বিরক্তির ছাপ।

পুরো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নদীতে হওয়ার কারণে সব অনুষ্ঠান সবাই দেখতে পায়নি। প্যারিস শহরের বিভিন্ন স্থাপত্যকে তুলে ধরা হয় এসব অনুষ্ঠানে। কিন্তু সেসব সম্প্রচারকারী সংস্থা টিভিতে দেখাতে পারলেও সিন নদীর তীরে বসে থাকা দর্শকদের ভরসা ছিলো জায়ান্ট স্ক্রিন।

প্যারেডের পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় সিন নদীর ধারে। একই সঙ্গে টিভিতে বা বড় পর্দায় ছিল বিশেষ তথ্যচিত্র। নটরডেমের সামনে পারফর্ম করল মুল্যাঁ রুজ। ১৮২০-এর দশকে সৃষ্টি হওয়া একটি বিশেষ নাচ ফিরিয়ে আনলো তারা। ছিলেন রিপাবলিকান গার্ডের বাদ্যযন্ত্রী এবং ফরাসি সেনার শিল্পীরা।

প্যারেডের শেষ তিন দেশ হিসাবে পরপর এলো অস্ট্রেলিয়া (২০৩২ অলিম্পিকের আয়োজক), আমেরিকা (২০২৮ সালের আয়োজক) এবং ফ্রান্স (এবারের আয়োজক)। ফ্রান্সের নৌকাটি ছিল বাকি সবার চেয়ে আলাদা। ফ্রান্সের নৌ যখন এগিয়ে এলো, আইফেল টাওয়ার আলোয় ঝিকমিক করে উঠলো।

উদ্বোধনীতে আসা অতিথির তালিকাও নজরকাড়া। ছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো, স্পেনের রাজা কিং ফিলিপ, জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেজ, কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল সানি, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির প্রেসিডেন্ট টমাস বাখসহ বিশ্বের বহু রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিকরা।
এবারের গেমসে বাংলাদেশ থেকে অংশ নিচ্ছেন পাঁচ ক্রীড়াবিদ। এর মধ্যে কেবল আর্চার সাগর প্যারিসে গেছেন যোগ্যতা অর্জন করে। বাকি চারজন গেমসে অংশ নেবেন আইওসি’র ওয়াইল্ডকার্ড নিয়ে।
অলিম্পিকের স্বপ্নপূরণে এক শরণার্থীর অবিশ্বাস্য যাত্রা!