ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে পা রাখছে আর্জেন্টিনা। আলবিসেলেস্তেদের সামনে এবার লক্ষ্য,গত ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম দল হিসেবে টানা দু’বার বিশ্বজয়ের গৌরব অর্জন করা। ফুটবল ইতিহাসে মাত্র দুটি দল এই অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছে; ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে ইতালি এবং ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পেলের ব্রাজিল।
দীর্ঘ ৬৪ বছর ধরে এই রেকর্ড আর কেউ ভাঙতে পারেনি, যা প্রমাণ করে মহাতারকা লিওনেল মেসি ও তাঁর সহযোদ্ধাদের সামনে কত বড় এক অগ্নিপরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
তবে ইতিহাস যতই কঠিন হোক না কেন, বর্তমান আর্জেন্টিনা দলটিকে দেখে বাজি ধরার লোকের অভাব নেই। কোচ লিওনেল স্কালোনি কাতার বিশ্বকাপের সেই অদম্য দলটির মূল শক্তিকে অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। আর ৩৮ বছর বয়সী ফুটবল জাদুকর মেসি তাঁর রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে দলটিকে নেতৃত্ব দিতে তৈরি।
লাতিন আমেরিকার বাছাইপর্বে রীতিমতো রাজত্ব করে বিশ্বকাপে এসেছে আর্জেন্টিনা; ১৮টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র ৪টিতে হেরে টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইকুয়েডরের চেয়ে স্পষ্ট ৯ পয়েন্ট এগিয়ে থেকে তারা শীর্ষস্থান দখল করেছিল। বাছাইপর্বের এই বিধ্বংসী ফর্ম ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া এবং জর্ডানকে নিয়ে গঠিত ‘গ্রুপ জে’ পার হওয়া আর্জেন্টিনার জন্য শুধু সময়ের ব্যাপার।

ইউরোপীয় কাঁটা ও স্কালোনির আসল পরীক্ষা
আগামী ১৬ জুন কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বজয়ের মিশন শুরু করবে আর্জেন্টিনা। তবে গ্রুপ পর্ব সহজ হলেও টুর্নামেন্টের গভীরেই লুকিয়ে আছে স্কালোনির আসল ‘অ্যাসিড টেস্ট’। ২০২২ সালের সেই মহাকাব্যিক ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে বধ করার পর গত সাড়ে তিন বছরে ইউরোপের কোনো পরাশক্তির বিরুদ্ধে একটি ম্যাচও খেলেনি আর্জেন্টিনা। ফলে নকআউট পর্বে ইউরোপীয় এলিটদের মুখোমুখি হলে মেসিরা কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
রিয়াদ মাহরেজের আলজেরিয়া এবং ৪৪ বছর আগের গিজনের কলঙ্ক
গ্রুপ ‘জে’-তে আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হতে পারে আলজেরিয়া। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের পর এই প্রথম বিশ্বমঞ্চে ফিরছে মরুভূমির শেয়ালরা। আফ্রিকান বাছাইপর্বে উগান্ডাকে ৭ পয়েন্টে পেছনে ফেলে দাপটের সঙ্গে টিকিট কেটেছে তারা।
ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক তারকা রিয়াদ মাহরেজের চতুর অধিনায়কত্ব এবং ভিএফএল উলফসবার্গের গতিময় ফরোয়ার্ড মোহাম্মদ আমোরার গোলক্ষুধা যেকোনো ডিফেন্স গুঁড়িয়ে দিতে পারে।

তবে আলজেরিয়ার জন্য এই গ্রুপটি কেবল পরের রাউন্ডে যাওয়ার লড়াই নয়, ৪৪ বছর আগের এক চরম অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার মোক্ষম মঞ্চ! ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে আলজেরিয়া পশ্চিম জার্মানি ও চিলিকে হারিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু গ্রুপের শেষ ম্যাচে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া একে অপরের সঙ্গে এমন এক ‘সমঝোতার’ খেলা খেলে, যেখানে জার্মানি ১-০ গোলে জিতলে দুই ইউরোপীয় দলই পরের রাউন্ডে যাবে আর আলজেরিয়া বাদ পড়বে।
মাঠে ঠিক তা-ই ঘটেছিল, যা ফুটবল ইতিহাসে গিজনের কলঙ্ক নামে কুখ্যাত। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পরই ফিফা নিয়ম করতে বাধ্য হয়, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবে। এবার অস্ট্রিয়াকে সামনে পেয়ে সেই ঐতিহাসিক প্রতারণার শোধ তুলতে মরিয়া মাহরেজরা।

রাফ রাংনিকের অস্ট্রিয়া এবং নবাগত জর্ডান
অন্যদিকে জার্মান ফুটবল গুরু রাফ রাংনিকের কোচিং এবং রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ডেভিড আলাবার নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরেছে অস্ট্রিয়া। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে পেছনে ফেলে সরাসরি মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়া এই দলটি আর্জেন্টিনাকে কঠিন টক্কর দিতে প্রস্তুত।
আর এই গ্রুপের চতুর্থ দলটি হলো এশিয়ার নবাগত শক্তি জর্ডান। সন হিউং-মিনের দক্ষিণ কোরিয়ার পেছনে থেকে এশিয়ান বাছাইপর্বে দ্বিতীয় হয়ে নিজেদের ইতিহাসের প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট কেটে রূপকথা তৈরি করেছে তারা। আলবিসেলেস্তেদের রাজত্ব বনাম আফ্রিকার প্রতিশোধের আগুন, সব মিলিয়ে গ্রুপ ‘জে’ যে ফুটবলের এক ‘সসি’ ককটেলে রূপ নিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য!
ট্রফি ধরে রাখার মিশনে কতটা প্রস্তুত অপ্রতিরোধ্য মেসি?