ফুটবল খেলায় ‘বাপ কা বেটা, সিপাই কা ঘোড়া’ প্রবাদটি যেন বারবার সত্যি হয়ে ধরা দেয়। তবে, ২০২৬ সালের চলতি বিশ্বকাপ এই আবেগ আর উত্তরাধিকারের গল্পে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। মাঠের লড়াই তো চলছেই, কিন্তু পর্দার আড়ালে এবার এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক স্পর্শ করল বিশ্বফুটবল।
বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এতদিন যে ‘বাবা-ছেলে’ জুটির তালিকাটি ছিল মাত্র ২৭ জোড়ার, চলতি ২০২৬ আসরে এক ধাক্কায় তাতে যোগ হয়েছে আরও ১০টি নতুন নাম! অর্থাৎ, ফুটবল ইতিহাসের রাজকীয় এই মঞ্চে পিতা ও পুত্রের একসঙ্গে দাপিয়ে বেড়ানোর কীর্তি এখন মোট ৩৭ জোড়ায় গিয়ে ঠেকল।


এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি লাইমলাইট কেড়ে নিয়েছেন আলজেরিয়ার গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ানো লুকা জিদান। বিশ্বখ্যাত ফরাসি মিডফিল্ডার ও কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের এই পুত্র এবার ফ্রান্সের জার্সিতে নয়, বরং নিজের দাদা-দাদীর দেশ আলজেরিয়ার হয়ে গ্লাভস হাতে বিশ্বমঞ্চে নেমেছেন।
অন্যদিকে, বিশ্বফুটবলের বর্তমান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডও বাবার পথ ধরে কাঁপানো শুরু করেছেন। তাঁর পিতা আলফি হালান্ড ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে নরওয়ের হয়ে রাইট-ব্যাক পজিশনে খেলেছিলেন, যিনি আজকের দিনে ছেলের মতো অতটা প্রচারের আলোয় ছিলেন না। নরওয়ে দলের আরও এক জুটি এবার ইতিহাস লিখেছে, সাবেক গোলরক্ষক এরিক থর্স্টভেটের ছেলে ক্রিস্টিয়ান থর্স্টভেটও বাবার মতোই বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছেন।


পর্তুগিজ শিবিরেও বইছে আবেগের বন্যা। কোচ তথা পর্তুগালের সাবেক তারকা সার্জিও কনসেইসাওয়ের ছেলে ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও এবার খেলছেন জাতীয় দলে। ২৪ বছর পর বাবার রেখে যাওয়া জুতোয় পা গলিয়ে ফ্রান্সিসকো আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, আমার বাবা বিশ্বকাপে খেলেছেন আর আজ ২৪ বছর পর আমি এখানে, এটা ভাবলেই বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। যদিও তাদের সেই বিশ্বকাপটা গ্রুপ পর্বেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, আমি আশা করি আমার গল্পটা অন্যরকম হবে। ফুটবল আর ব্যক্তিগত জীবন, সবখানেই বাবাই আমার সেরা পরামর্শদাতা।
নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার প্যাট্রিক ক্লুইভার্টের সেই ১৯৯৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে করা গোলটি কার না মনে আছে? এবার ডাচ জার্সিতে সেই উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে এসেছেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র জাস্টিন ক্লুইভার্ট।


পিছিয়ে নেই আর্জেন্টিনাও, অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের বর্তমান মাস্টারমাইন্ড ডিয়েগো সিমিওনের ছেলে জিউলিয়ানো সিমিওনে এবং পাবলো পাজের ছেলে নিকো পাজ এই অভিজাত তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেগ বারহাল্টারের ছেলে সেবাস্টিয়ান বারহাল্টার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইউলিয়ং লি-এর ছেলে লি তাইসক এবারের বিশেষ সংযোজন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে লাতিন আমেরিকার অন্যতম পরাশক্তি ব্রাজিলের হয়ে কিন্তু এমন কীর্তি মাত্র একটিই আছে! ডমিঙ্গো দা গুইয়া (১৯৩৮ বিশ্বকাপ) এবং পালমেইরাসের আইডল আদেমির দা গুইয়া (১৯৭৪ বিশ্বকাপ), এই এক জোড়া বাবা-ছেলেই শুধু সেলেসাওদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
১৯৯০ ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপ মাতানো মাজিনহোর ছেলে থিয়াগো আলকান্তারা ব্রাজিলিয়ান জুটি হতে পারতেন, কিন্তু তিনি স্পেনের নাগরিকত্ব নিয়ে ২০১৮ সালে 'লা রোজা'দের হয়ে খেলায় সেই স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি। তবে ২০২৬ সালের এই আসর সব হিসাব চুকিয়ে ফুটবল রোমান্টিকদের উপহার দিল এক অদ্ভুত সুন্দর সোনালী অধ্যায়, যেখানে মাঠের ঘাসে মিশে গেছে দুই প্রজন্মের রক্ত আর ঘাম!
