চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আলাওল ও এ.এফ. রহমান হলের মধ্যবর্তী একটি ছোট ক্যাফেটেরিয়া সংস্কারের নামে লাখ লাখ টাকা লুটের ছক কষা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। নথিতে উন্নতমানের নির্মাণসামগ্রী, অতিরিক্ত পরিমাণ রড-টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রীর হিসাব দেখিয়ে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ নেওয়া হলেও বাস্তবে মিলেছে চরম জালিয়াতি ও নিম্নমানের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীদের তৈরি করা ত্রুটিপূর্ণ এস্টিমেট ও যথাযথ তদারকির অভাবেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই হরিলুটের সুযোগ পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্ধারিত সময়ের দেড় মাস পর, গত পয়লা জুলাই অসমাপ্ত অবস্থাতেই চালু করা এই ক্যান্টিনের কাজ নিয়ে দুই হলের সাধারণ শিক্ষার্থী ও হল সংসদের নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত আট মার্চ ক্যাফেটেরিয়াটি সংস্কারের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাফিজা এন্টারপ্রাইজকে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত ১৪ মে কাজ শেষ করে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের দেড় মাস পর শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে গত পয়লা জুলাই অসমাপ্ত অবস্থাতেই ক্যান্টিনটি চালু করা হয়। এই কাজের তদারকিতে ছিলেন এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার এমদাদুল হক রিয়াল, সুপারিন্টেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আজম এবং ইলেকট্রনিক কাজের দায়িত্বে ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মহসিন উদ্দীন।
প্রকল্পের নথি বিশ্লেষণ এবং সরেজমিন পর্যবেক্ষণে সিভিল, স্যানিটারি ও বৈদ্যুতিক কাজের প্রতিটি খাতেই বড় ধরনের ফারাক পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে রড ও ছাদ সংস্কারে প্রায় এক হাজার ২০০ বর্গফুটের ছাদ সংস্কারের জন্য কাগজে দুই হাজার কেজি রড দেখানো হলেও ঠিকাদারের ভাষ্যমতে, অর্ধেকেরও কম রড ব্যবহার করা হয়েছে। সংস্কারের পরও ছাদ ও দেয়াল চুইয়ে পানি পড়ছে।
তিনটি কক্ষে ফ্লোর টাইলসের জন্য নথিতে ১৯০ বর্গমিটার আয়তন দেখিয়ে দুই লাখ ৫৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। অথচ সরেজমিনে কক্ষগুলোর প্রকৃত আয়তন ৮০০ থেকে ৯০০ বর্গফুটের বেশি নয়। একইভাবে ওয়াল টাইলসের জন্য ৬৪ বর্গফুট দেখিয়ে ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে বেসিনের পাশে সামান্য টাইলস মিলেছে।
দুটি ছোট দরজা পরিবর্তনের জন্য ৭৪ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও ব্যবহৃত দরজার মান ও আকার অত্যন্ত নিম্নমানের। এছাড়া অ্যাক্রেলিক রং ব্যবহারের কথা থাকলেও নিম্নমানের রং করায় কাজ শেষ হওয়ার আগেই আস্তরণ খসে পড়ছে।
কার্যাদেশে ৯৭৯ টাকা মূল্যের ছয়টি পিতলের ট্যাপের বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে লাগানো হয়েছে ১০০ টাকা মূল্যের প্লাস্টিকের ট্যাপ। তিনটি বেসিনের জায়গায় দুটি পাওয়া গেছে এবং কিচেন সিংক ও গ্লাস শেলফের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। ১৫টি টিউবলাইটের বরাদ্দ থাকলেও তা লাগানো হয়নি এবং ফ্যান-বাল্ব সবই নিম্নমানের ব্যবহার করা হয়েছে।
আলাওল হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক নুরনবী হাসান বলেন, বাজেটের তুলনায় কাজ হয়নি বিধায় আমরা ক্যাফেটেরিয়া বন্ধ রেখেছিলাম। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে, রংয়ের কোয়ালিটি খারাপ এবং বৈদ্যুতিক কাজে অনুন্নত সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এই চুরির জন্য ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ার সবাই দায়ি।
এ.এফ. রহমান হল সংসদের জিএস তামিম চৌধুরীও কাজের শিডিউল না পাওয়া এবং নানা অসঙ্গতির কথা জানান। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. হাবিবুর রহমান সুমন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংস্কার কাজ দেখে কোথাও মনে হয় না যে এখানে ১৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ কোনো বক্তব্য না দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেন এবং ‘আপনারা যা পারেন করেন’ বলে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
আলাওল হলের প্রভোস্ট জামালুল আকবর চৌধুরী জানান, দুর্নীতির প্রমাণ মিললে তিনি অর্থছাড়ের নথিতে সই করবেন না।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাফিজা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. রিয়াদ নিজের ভুলের কথা স্বীকার করে প্রতিবেদকের সঙ্গে বিষয়টি ‘সেটেলমেন্ট’ করার প্রস্তাব দেন। চবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্টার ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রকৌশল দপ্তরের বিষয়ে আগেও অভিযোগ উঠেছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল ফোরকান বলেন, আমি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছি এবং এই টেন্ডারটি আমার আগে দেওয়া হয়েছে। তবে দুর্নীতি যেখানেই হোক, আমি অবশ্যই এটি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করবো। দুর্নীতির প্রমাণ পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে এবং জড়িত ঠিকাদারদের কালো তালিকাভুক্ত করা হবে।
