মঙ্গলবার রাত ১টায় ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে যখন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্স এবং স্পেন মুখোমুখি হবে, তখন পুরো ফুটবল বিশ্ব যে এক অলৌকিক ও রোমাঞ্চকর থ্রিলার দেখতে যাচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! একদিকে দিদিয়ের দেশমের ‘লেস ব্লুস’রা টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে নামবে, অন্যদিকে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বিশ্বজয়ের পর প্রথমবার ফাইনালের টিকিট কাটতে মরিয়া লুইস দে লা ফুয়েন্তের ‘লা রোহা’।
ডালাসের এই ময়দানে আজ কার তিকিতাকা ফুটবল রাজত্ব করবে, আর কার গতি প্রতিপক্ষকে ছারখার করে দেবে, তা নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

গ্রুপ পর্বে সেনেগাল, ইরাক ও নরওয়েকে চাটনি বানিয়ে আই-গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে এসেছিল ফ্রান্স। এরপর সুইডেন, প্যারাগুয়ে এবং সবশেষে কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কঠিন আফ্রিকান প্রাচীর ভেঙে ২-০ ব্যবধানের এক নিয়ন্ত্রিত জয়ে শেষ চারে পা রাখে তারা।
ফরাসিদের এই বিজয়রথের প্রধান সেনাপতি খোদ অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে, যিনি ইতিমধ্যে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে আছেন। এমবাপ্পের এই গোলক্ষুধার পাশাপাশি উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে এবং ডেজিরে দুয়ের মতো একঝাঁক তরুণ তুর্কি ফরাসি আক্রমণভাগকে প্রতিপক্ষের জন্য এক জীবন্ত ওভেনে পরিণত করেছেন।
ফ্রান্সের এই বিধ্বংসী আক্রমণকে রুখে দিতে স্পেনের রয়েছে এই আসরের সবচেয়ে নিরেট ও ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগ। এইচ-গ্রুপের শীর্ষস্থান ধরে রেখে অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল এবং কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে বর্তমান ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নরা।

বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ম্যাচে তারা টুর্নামেন্টের প্রথম গোলটি হজম করে; এর আগে টানা ৬টি ম্যাচে কোনো গোল না খাওয়ার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছিল উনাই সিমোনের রক্ষণভাগ। বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর শেষ মুহূর্তের ম্যাজিক গোল স্পেনের এই অপরাজেয় যাত্রাকে টিকিয়ে রাখে। নিজেদের পায়ে বল রেখে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রতিপক্ষকে নাচানোই স্পেনের প্রধান শক্তি।
পুরনো হিসাব-নিকাশ: দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস কিন্তু স্পেনের পক্ষেই কথা বলছে। গত ৩৮ বারের দেখায় স্পেন জিতেছে ১৮টি ম্যাচে, আর ফ্রান্সের জয় ১৩টিতে, বাকি ৭টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। মাত্র এক বছর আগে নেশনস লীগের সেমিফাইনালে দুই দল যখন মুখোমুখি হয়েছিল, তখন ফুটবলবিশ্ব দেখেছিল এক অতিমানবীয় ৯ গোলের থ্রিলার, যেখানে ফ্রান্সের শেষ মুহূর্তের কামব্যাক রুখে দিয়ে স্পেন জিতেছিল ৫-৪ ব্যবধানে! এমনকি ২০২৪ সালের ইউরোর সেমিফাইনালেও ফ্রান্সকে লাথি মেরে বিদায় করেছিল এই স্প্যানিশরাই। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে ইতিহাস একটু ভিন্ন। ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র একমাত্র দেখায় স্পেনকে ৩-১ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স।

ড্রেসিংরুমের হাওয়া ও সম্ভাব্য একাদশ: ফরাসি শিবিরের জন্য স্বস্তির খবর হলো, মরক্কো ম্যাচে গোড়ালিতে সামান্য চোট পেলেও অধিনায়ক এমবাপ্পে মঙ্গলবারের মহাযুদ্ধে শুরু থেকেই থাকছেন। চোট কাটিয়ে মাঝমাঠের প্রধান ভরসা অরেলিয়েন চুয়ামেনি এবং মানু কোনেও একাদশে ফিরছেন।
অন্যদিকে, বেলজিয়াম বধের নায়ক মেরিনোকে একাদশে রাখা নিয়ে মধুর সমস্যায় পড়েছেন ফুয়েন্তে। মাঝমাঠের স্তম্ভ রদ্রি তো থাকছেনই, তাঁর সাথে ফাবিয়ান রুইজ, পেদ্রি ও দানি ওলমোর মধ্যে চলবে জায়গা পাওয়ার লড়াই। টুর্নামেন্টে নিজের চেনা ছন্দের চেয়ে কিছুটা শান্ত থাকা ১৭ বছরের বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামাল রাইট উইংয়ে নিজের জায়গা ধরে রাখবেন, আর আক্রমণের দায়িত্বে থাকবেন মিকেল ওয়ারজাবাল।
ফ্রান্সের সম্ভাব্য একাদশ: মাগনান; কুন্দে, উপামেকানো, সালিবা, দিনিয়ে; চুয়ামেনি, রাবিও; দেম্বেলে, অলিসে, দুয়ে; এমবাপ্পে।
স্পেনের সম্ভাব্য একাদশ: সিমোন; পোরো, কুবারসি, লাপোর্তে, কুকুরেয়া; রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ, পেদ্রি; ইয়ামাল, ওলমো, ওয়ারজাবাল।

ম্যাচ প্রেডিকশন: মঙ্গলবারের এই ম্যাচটি হতে যাচ্ছে চরম এক ট্যাকটিক্যাল লড়াই। স্পেন যেখানে মাঠ জুড়ে বলের দখল রেখে ফ্রান্সকে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করবে, সেখানে ফ্রান্স ওত পেতে থাকবে কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য। স্পেনের হাই-লাইন ডিফেন্সের ফাঁক গলে এমবাপে আর দেম্বেলের চিতার গতি যে কোনো মুহূর্তে খেলা ঘুরিয়ে দিতে পারে।
তবে টানা ৩৬ ম্যাচে অপরাজিত থাকা স্পেনের এই সোনালী প্রজন্মকে সহজে হারানো প্রায় অসম্ভব। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ৯০ মিনিটে এই দুই পরাশক্তিকে আলাদা করা যাবে না। তবে, অতিরিক্ত সময়ের রুদ্ধশ্বাস নাটকে ফ্রান্সকে ২-১ ব্যবধানে টেক্কা দিয়ে ফাইনালের টিকিট কেটে নিতে পারে স্পেনের নবাবরা!
