বিশ্বমঞ্চে বুধবার সকাল ১০টায় জে-গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে এক নতুন রূপকথার জন্ম হতে যাচ্ছে। সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের চিতা ‘অস্ট্রিয়া’ এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নেওয়া এশিয়ার বিষ্ময় ‘জর্ডান’।
১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বমঞ্চে পা রাখা অস্ট্রিয়ার লক্ষ্য ১৯৫৪ সালের পর আবারও নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, জর্ডানের লক্ষ্য তাদের প্রথম অংশগ্রহণেই রূপকথা লিখে ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেওয়া। জে-গ্রুপে আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়ার মতো কঠিন প্রতিপক্ষ থাকায়, দুই দলের জন্যই টুর্নামেন্টে টিকে থাকার আসল লড়াই শুরু হচ্ছে এই ম্যাচ দিয়েই।
অস্ট্রিয়ার মাস্টারমাইন্ড কোচ রালফ র্যাংকনিকের অধীনে দলটি এখন উড়ছে। ইউরোপীয় অঞ্চলের বাছাই পর্বে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে টপকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে টিকিট কেটেছে তারা। এরপর ঘানা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তিউনিসিয়ার মতো পরাশক্তিদের প্রীতি ম্যাচে হারিয়ে টানা জয়ের রথে চড়েছে অস্ট্রিয়া।

পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপীয় বাছাইপর্বে অস্ট্রিয়ার চেয়ে তীব্র গতিতে এবং কড়াভাবে কোনো দল প্রতিপক্ষকে ‘প্রেসিং’ করতে পারেনি। প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার এই আগ্রাসী ফুটবলই আগামীকাল জর্ডানের জন্য প্রধান মাথাব্যথার কারণ হবে।
বিপরীতে, প্রথমবার বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করে ইতিহাস গড়লেও জর্ডানের সাম্প্রতিক ফর্ম মোটেও ভালো যাচ্ছে না। নিজেদের শেষ ৫টি ম্যাচের একটিতেও জয়ের মুখ দেখেনি জামাল সেলামির শিষ্যরা। শেষ ৪টি প্রীতি ম্যাচের দুটিতে ড্র এবং দুটিতে হেরে বেশ কিছুটা ব্যাকফুটে থেকেই মাঠে নামছে তারা।
মাঠের লড়াইয়ের আগে দু’দলেই লেগেছে চোটের হাওয়া। অস্ট্রিয়ার অন্যতম সেরা ক্রিস্টোফ বাউমগার্টনার ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেছেন, তাঁর জায়গায় দলে এসেছেন দেজান লিউবিচিস।
তারকা ডেভিড আলাবা শুরু থেকেই খেলবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন কোচ। বাউমগার্টনারের অনুপস্থিতিতে দলের আক্রমণভাগ সামলানোর দায়িত্ব থাকবে মার্সেল সাবিৎজার এবং ৩৭ বছর বয়সী বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখানো মারো আরনাউটোভিচের ওপর।
অন্যদিকে, জর্ডান শিবিরে লেগেছে এক মরণকামড়। দলের সেরা তারকা ও গোলমেশিন ইয়াজান আল-নাইমাত চোটের কারণে খেলতে পারছেন না। বাছাইপর্বে একাই ৮ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করা এই ফরোয়ার্ডের না থাকা জর্ডানের জন্য এক বিরাট বিপর্যয়। এছাড়াও দল থেকে ইব্রাহিম সাব্রা ছিটকে যাওয়ায় সুযোগ পেয়েছেন মোহাম্মদ তাহা।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অস্ট্রিয়ার সেরা সাফল্য এসেছিল ১৯৫৪ সালে, যেখানে তারা তৃতীয় হয়েছিল। সেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৭-৫ গোলে হারিয়েছিল অস্ট্রিয়া, যা আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড!
৩৭ বছর বয়সী স্ট্রাইকার মার্কো আরনাউটোভিচ বাছাইপর্বেই ৪৭ গোল করে দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসেছেন।
জর্ডানের কোচ জামাল সেলামি ইতিহাসের চতুর্থ মরক্কান হিসেবে বিশ্বকাপে কোচিং করাচ্ছেন, তবে তিনিই প্রথম মরক্কান যিনি নিজ দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের (জর্ডান) ডাগআউটে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে দাঁড়িয়েছেন।
এশিয়ান অঞ্চলের বাছাইপর্বে জর্ডান ঘরের বাইরে একটি ম্যাচও হারেনি (৪ জয়, ৪ ড্র)। ২০২৩ সালের এশিয়ান কাপের রানার্স-আপ জর্ডান এবার ২০১০ সালের স্লোভাকিয়ার পর প্রথম ডেবিউট্যান্ট দেশ হিসেবে নকআউটে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
ফুটবল পণ্ডিত ও বোদ্ধাদের মতে, প্রথমবার বিশ্বকাপে এসে জর্ডান কোটি ভক্তের মন জয় করলেও আল-নাইমাতের অনুপস্থিতি এবং দলের ভঙ্গুর ডিফেন্স তাদের বড় শান্তিতে থাকতে দেবে না। রালফ র্যাংকনিকের হাই-প্রেসিং ফুটবলের গতি সামলানো জর্ডানের জন্য একপ্রকার অসম্ভব হবে। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে সাবিৎজার-আরনাউটোভিচদের জোড়া আক্রমণে অস্ট্রিয়া ৩-১ ব্যবধানে জর্ডানকে হারিয়ে বিশ্বকাপে শুভসূচনা করবে, এমনটাই ফুটবল বিশেষজ্ঞদের কড়া প্রেডিকশন!
