বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে মরক্কোর ঐতিহাসিক স্বপ্নযাত্রা গুঁড়িয়ে দিয়ে টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পা রাখল ফ্রান্স। আর, এই দুর্দান্ত জয়ের পর ফরাসি শিবিরের ধারাবাহিকতা এবং বড় টুর্নামেন্টে ম্যাচ জেতার ক্ষুরধার কৌশলের প্রশংসায় মেতেছেন কোচ দিদিয়ের দেশম।
টুর্নামেন্টের হট-ফেভারিট ফরাসিরা বৃহস্পতিবার রাতের ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপে এবং উসমান দেম্বেলের দ্বিতীয়ার্ধের গোলে ২-০ ব্যবধানের এক আরামদায়ক জয় তুলে নিয়েছে।

ম্যাচের প্রথমার্ধে এমবাপ্পের একটি পেনাল্টি শট মরক্কোর বাজপাখি খ্যাত গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো রুখে দিলে ম্যাচটি বেশ স্নায়ুচাপের দিকে মোড় নেয়। তবে প্রথমার্ধের সেই খলনায়কই দ্বিতীয়ার্ধে অতিমানবীয় রূপ নিয়ে এক জাদুকরী গোল করেন, যা চলতি আসরে তাঁর ৮ম গোল এবং এর মাধ্যমে তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে উঠে এসেছেন।
পেনাল্টি মিসের পর এমবাপ্পের এমন রাজকীয় প্রত্যাবর্তন নিয়ে ম্যাচ শেষে কোচ দেশম বলেন, টানা তিনবার সেমিফাইনাল, ভাবতেই দারুণ লাগছে। আপাতদৃষ্টিতে এটাকে খুব স্বাভাবিক বা যৌক্তিক মনে হতে পারে, কিন্তু মাঠের কাজটা মাঠেই সারতে হয়। প্রথমার্ধের পেনাল্টি মিসের পর পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হয়েছিল, বিশেষ করে সেটা যখন কিলিয়ানের মতো খেলোয়াড় মিস করে। তবে ওর মনে নিজের প্রতি কোনো সংশয় ছিল না।
ম্যাচের শেষ দিকে গোড়ালিতে চোট পাওয়ায় এমবাপেকে তুলে নিয়েছিলেন দেশম। তবে, সেটিকে বড় কোনো সমস্যা না ভেবে আত্মবিশ্বাসী কোচ যোগ করেন, আমরা ঠিক যে জায়গায় পৌঁছাতে চেয়েছিলাম, সেখানেই আছি। আজ আমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নিলাম, যা প্রমাণ করে বিশ্ব ফুটবলের চূড়াতেই আমাদের অবস্থান।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সেমির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে এবারও মরক্কোকে কাঁদাল ফ্রান্স। নক-আউটের তিনটি ম্যাচেই কোনো গোল না খাওয়া ফরাসি ডিফেন্সের সামনে ইনজুরিতে আক্রান্ত মরক্কোকে বড্ড নিষ্প্রাণ দেখিয়েছে। দলের প্রধান ফরোয়ার্ড ইসমায়েল সাইবারির অনুপস্থিতি মরক্কোকে এতটাই ভুগিয়েছে, ম্যাচের ৮৪ মিনিটের আগে তারা ফ্রান্সের গোলপোস্টে একটি শটও নিতে পারেনি।
এমবাপের ৬০ মিনিটের সেই ডেডলক ভাঙা গোলের ঠিক ছয় মিনিট পরেই উসমান দেম্বেলে মরক্কোর কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেন। ম্যাচ শেষে চরম হতাশ মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি বলেন, আমরা ভীষণভাবে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের মানতেই হবে যে ফ্রান্স দুর্দান্ত সব খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া এক পরাশক্তি। তাদের গোল করার সুযোগ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। আমাদের পরিকল্পনার অভাব ছিল এবং ফুটবলারদের মাঝেও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল।

তবে এখনই ভেঙে পড়ছেন না ওয়াহবি। ২০৩০ সালে স্পেন ও পর্তুগালের সাথে যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বেশ 'সসি' এক হুংকার ছেড়ে বলেন, আজ ফ্রান্স শক্তিশালী ছিল ঠিকই, কিন্তু আমরাও লড়াই করতে জানি। আমরা আরও উন্নতি করব এবং হয়তো চার বছর পর (পরের বিশ্বকাপে) এই ফ্রান্সকেই আমরা টুর্নামেন্ট থেকে লাথি মেরে বিদায় করব!
ফরাসি শিবিরের আনন্দ উদযাপনের সময় একদমই নেই, তাদের চোখ এখন আগামী মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ডালাসে অনুষ্ঠেয় ব্লকবাস্টার সেমির দিকে; যেখানে তাদের মুখোমুখি হতে হবে স্পেন বা বেলজিয়ামের। ম্যাচের শেষ দিকে গোড়ালির ইনজুরি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হলেও, ফ্রান্সকে ইতিহাসের তৃতীয় বৈশ্বিক মুকুট এনে দিতে কিলিয়ান এমবাপে যে কতটা ক্ষুধার্ত, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট।
একটি বিশেষ মিশন নিয়ে খেলছেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে এমবাপে বেশ চনমনে মেজাজে বলেন, মিশন কিনা জানি না, তবে আমরা এখন গা ভাসিয়ে দিতে পারি না। সামনে এখনো দীর্ঘ পথ বাকি এবং সামনের লড়াইগুলো আরও কঠিন হতে যাচ্ছে। তবে আমরা খুব দ্রুত রিকভারি করে মাঠে ফিরব।
