বুয়েনোস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে মঙ্গলবার রাতে নেমে এসেছিল এক পরম আবেগঘন ও বিষাদময় পরিবেশ। আফ্রিকার দেশ বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয়ের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের আকাশি-সাদা জার্সিতে নিজের বর্ণাঢ্য, রূপকথাতুল্য ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত ইতি টানলেন মহাতারকা লিওনেল মেসি।
আন্তর্জাতিক প্রীতি উইন্ডোর প্রথম দুটি ম্যাচে বিশ্রামে থাকার পর, নিজের ২০৮তম এবং শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে নেমে ঘরের দর্শকদের ভালোবাসায় সিক্ত হন এই ফুটবল ঈশ্বর।

ম্যাচের শুরু থেকেই গ্যালারি জুড়ে ছিল কেবলই 'মেসি বন্দনা'। মহাতারকার সম্মানার্থে ম্যাচের ১০ম মিনিটে খেলা সাময়িকভাবে থামিয়ে এক বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদর্শন করা হয়। বিদায়ী মঞ্চেও নিজের চিরচেনা জাদুকরী রূপ বজায় রেখেছিলেন ৩৯ বছর বয়সী এই অধিনায়ক; দলের ৩-০ গোলের জয়ে নিজেই একটি দৃষ্টিনন্দন গোল করেন এবং বাকি দুটি গোলেই সরাসরি অ্যাসিস্ট করেন।

তবে আসল আবেগঘন দৃশ্যপটের সৃষ্টি হয় শেষ বাঁশি বাজার পর। গ্যালারিতে উপস্থিত ৮০ হাজারেরও বেশি কানায় কানায় পূর্ণ দর্শকের সামনে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন কাতার বিশ্বকাপ ও টানা দুটি কোপা আমেরিকাজয়ী এই অধিনায়ক। ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে অভিষেক থেকে শুরু করে দীর্ঘ দুই দশকের চড়াই-উতরাই ও সংগ্রামের কথা স্মরণ করে কান্নাভেজা কণ্ঠে মেসি বলেন, আমার ইচ্ছে করে জীবনের বাকিটা সময়ও এই দলের হয়ে খেলে যাই, কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে সুন্দর আর কিছুই হতে পারে না। এই দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পবিত্র শার্টটি রক্ষা করতে পারা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয়।

সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে মেসি বলেন, আমি সবসময় জানতাম যে আমার পাশে একদল নির্ভীক যোদ্ধা আছে, যারা যে কোনো প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে ভয় পায় না। দেশের ভক্ত-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি স্মরণ করেন কাতার বিশ্বকাপ জিতে দেশে ফেরার পর লাখ লাখ মানুষের সেই রূপকথার সংবর্ধনার কথা। ভিডিওতে এখনো সেই দৃশ্য দেখলে চোখে পানি চলে আসে জানিয়ে মেসি বলেন, এটি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা ছিল।

নিজের বিদায়কে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন ও কষ্টের মুহূর্ত আখ্যা দিয়ে কান্না চেপে মেসি বলেন, আজ আবার এই মাঠে দাঁড়িয়ে আমি নিশ্চিতভাবেই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিনটির মুখোমুখি হচ্ছি। আমি আপনাদের খুব মিস করব, এই নীল-সাদা জার্সি পরে লড়াই করাটাকে মিস করব। একইসঙ্গে তিনি তরুণ প্রজন্মকে কঠিন সময়েও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

অধিনায়কের এমন হৃদয়স্পর্শী বিদায়ী ভাষণ চলাকালে মাঠের মধ্যে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। চেলসি তারকাকে প্রকাশ্যে শিশুদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা যায়, যা সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি মানুষের চাপ, হতাশার দিন কাটিয়ে অবশেষে রেকর্ড গোলদাতা, বিশ্বজয়ী এবং ফুটবলের অমর নায়ক হিসেবে জাতীয় দলের আঙিনা থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
