মহালয়া থেকে ক্ষণ গণনা শুরু হলেও শারদোৎসবের আগমনী বার্তা জানিয়ে দেয় শরতের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর কাশফুল। তারপর শরতের স্নিগ্ধ সকালে শারদলক্ষ্মীকে বরণের বার্তা দেয় শিউলি, পরে ছাতিম। তখন বাঙালির মন দো দুল দুল দুলতে থাকে। প্রাণে প্রাণে জ্বলে খুশির তার।
বাংলার সেরা ঋতু হয়তো শরত নয়। কিন্তু আনন্দ, উপচারে তার ডালি যেন উপচে পড়ে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড়ো ধর্মীয় অনুষ্ঠান এই ঋতুতেই উদযাপিত হয়। ধর্মমত নির্বিশেষে এই ঋতু মানুষকে জড়িয়ে রাখে এক মায়াবী বন্ধনে। এই সময় দূরের স্বজনরা ঘরে ফেরে, ভ্রমণ পিপাসুরা বেড়িয়ে পড়ে পথে-প্রান্তরে। বাঙালির যা কিছু নিজস্ব তার মধ্যে শারদোৎসবের একটি নির্দিষ্ট স্থান আছে। এ সম্বন্ধে আর নতুন করে কিছু বলার নেই।
আজ ষষ্ঠী। দেবীর বোধন। বোধনের পর দেবীর অধিবাস৷ বেল তলায় দেবীর আরাধনা। গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী-সপরিবারে একরাত সেখানেই থাকবেন মা দুর্গা। সপ্তমীর সকালে পা দেবেন বাপের বাড়িতে।
সোমবার (১১ অক্টোবর) সকালে ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। ইতিমধ্যে বারোয়ারী পূজা মণ্ডপগুলো শশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বসে নেই বাড়ির পুজোগুলোও।
বোধন কী
ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন কেন তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু এর নেপথ্যে রয়েছে এক পৌরাণিক কাহিনী। বোধন অর্থ হলো জাগরণ বা জাগ্রত করা। রাবণের সঙ্গে যুদ্ধের সময় দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। তবে সে ছিল অকালবোধন। কিন্তু সেই বোধন ‘অকাল’ কেন, তার পেছনেও রয়েছে গল্প। পুরাণ মতে সূর্যের উত্তরায়ণ হচ্ছে দেবতাদের দিন। সূর্যের এই গমনে সময় লাগে ছয় মাস। এই ছয় মাস দেবতাদের একদিনের সমান। আর দিনের বেলায় দেবতারা জেগে থাকেন। তাই শাস্ত্র মতে দিনেই দেবতাদের পূজা করা হয়। আবার সূর্যের দক্ষিণায়ন হলো দেবতাদের রাত। সূর্যের এই গমনকালে ছয় মাসকে দেবতাদের এক রাত ধরা হয়। আর রাতে দেবতারা পূজার জন্য ‘অকাল’। কিন্তু দেবীর পূজা করতে হলে তো তার বোধন অর্থাৎ জাগরিত করতে হবে। তাই শরৎকালে এই অকাল বোধন হিসেবে ধরা হয়। তবে রামচন্দ্রের আগে প্রথম আদ্যাশক্তি মহামায়ার পূজা করেছিলেন রাজর্ষি শুঁঠ। আর তার সঙ্গী ছিলেন সমাধি বৈশ্য। সেই পূজাকে আমরা বর্তমানে বাসন্তী পূজা নামে জানি।
এবার আসা যাক দেবীর বোধন প্রসঙ্গে। রাবণ ছিলেন দেবাদিদেব মহাদেবের বর-প্রাপ্ত। আর দেবী দুর্গা বিভিন্ন রূপের একনিষ্ঠ সাধকও ছিলেন তিনি। কিন্তু রামের হাতে রাবণের বধ ছিল দৈববাণী। তাই রাম-রাবণের যুদ্ধ তখন অবশ্যম্ভাবী সেই সময় প্রজাপতি ব্রহ্মার দ্বারস্থ হলেন দেবতারা। কিন্তু দেবী তখন নিদ্রিতা। দেবতাদের অনুরোধে স্বয়ং ব্রহ্মা দেবীর পূজা করে তাকে তুষ্ট করার উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। দেবী বললেন, যদি রামচন্দ্র তার বোধন করেন, তবেই তিনি রাবণ বধে তাকে সাহায্য করবেন। রামকে দেবীর নির্দেশের কথা জানালেন প্রজাপতি ব্রহ্মা ও দেবরাজ ইন্দ্র। যেহেতু সময়টা ছিল শরৎকাল, তাই রামচন্দ্র নিজ হাতে দেবীর মূর্তি গড়ে তার আরাধনার প্রস্তুতি নিলেন। সেই সময় ধ্যানে বসে ব্রহ্মা দেখলেন একটি বিল্ব বৃক্ষের বা বেল গাছের নিচে একটি ৮-১০ বছরের বালিকা খেলা করছে। ব্রহ্মা বুঝলেন তিনি দেবী। তারপরেই প্রজাপতি স্থির করলেন দেবীর বোধনের পুজো হবে ওই বেলা গাছের নিচেই। সেই কারণে প্রথা মেনে আজও বোধনের আগে বেল গাছের পূজা করে তা প্রতিষ্ঠিত করা হয় দেবীর ঘটে। তারপরেই শুরু হয় বোধন, শুরু হয় দেবীর আরাধনা।
রঙিন উযদাপন
পাণ্ডিত্য শেষে এবার ফেরা যাক আনন্দোৎসবে। ইতিমধ্যে দেশজুড়ে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। ষষ্ঠীর সকাল থেকেই ঠাকুর দেখা, নতুন জামাকাপড়. নতুন জুতো, হৈ-হুল্লোড়, খাওয়া-দাওয়া৷ বাড়ির পুজোগুলোর সাবেকিয়ানা, বারোয়ারীর নান্দনিকতায় মিলে-মিশে রঙিন উদযাপন।
গ্রীষ্মের অভিঘাত, বর্ষার দুঃস্বপ্ন এবং জীবনের সব হতশ্রী দূর হোক শরতের শুদ্ধ স্পর্শে। সবার অন্তর্লোকে স্পন্দিত হয়ে উঠুক জীবন যাপনের মধুর ছন্দ।
আর দুর্গোৎসবের স্মৃতিগুলো ঝরে পড়ুক শিউলি আর ছাতিম হয়ে। শুভ শারদীয়া।
একাত্তর/এসি
