মিশরের রাজা তুতানখামেন। প্রাচীন মিশরের জনগণ মনে করতো, তিনি অর্ধেক মানুষ এবং অর্ধেক দেবতা। তবে দুনিয়াব্যাপী তার পরিচিতি বালক রাজা হিসবেই। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে ফারাও রাজবংশের অষ্টদশ রাজা হিসেবে ক্ষমতায় বসেন তিনি। তখন তার বয়স মাত্র ৯। কিন্তু তার রাজত্বকালেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়ছিলো মিশরীয় সভ্যতা।
১১ নভেম্বর ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং মিশরতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার তুতানখামেনের সমাধি আবিষ্কার করেন। তার সমাধির ভেতর থেকে মোট পাঁচ হাজার ৩৯৮টি প্রত্নবস্তু পাওয়া যায়। যার মধ্যে তুতানখামেনের ব্যক্তিগত ছুরিও ছিলো। ঘটনাক্রমে সেই ছুরি পৌঁছেছে জাপানে। এই ছুরি নিয়ে চালু আছে নানা ঐতিহাসিক গল্প। ফলে এ নিয়ে গবেষকদের আগ্রহের শেষ নেই।
জাপানের চিবা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা মিশরীয় বালক রাজার সেই ছুরি নিয়ে চালাচ্ছেন নানা পরীক্ষানিরীক্ষা। তারা বলছেন, এটা অন্য কোনো দেশ থেকে পাওয়া একটি উপহার। এটি মিশরের তৈরি হয়নি।
চিবা ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির গবেষক টোমোকো আরাই বলেন, ছুরিটির উৎপাদন এবং উৎপত্তির বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা দ্বি-মাত্রিক রাসায়নিক বিশ্লেষণসহ একাধিক পরীক্ষা করেছি।

তুতানখামেনের ছুরি
ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে, ছুরিটির হাতলে ব্যবহৃত আঁঠার সাথে মিতান্নি রাজ্যের বা এর আশেপাশের এলাকায় ব্যবহৃত একটি ধরনের আঁঠার সাথে মিল রয়েছে। উল্লেখ্য, এই মিতান্নি রাজ্যের অবস্থান ছিল বর্তমান তুরস্কের কাছাকাছি। এটি ছিলো আরেক প্রাচীন অঞ্চল।
জাপানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এনএইচকে ওই গবেষকদের জানায় যে, একটি প্রাচীন মিশরীয় দলিলে উল্লেখ করা আছে যে, মিতান্নির কাছ থেকে তুতানখামেনের মাতামহ (নানা) একটি ছুরি উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০১৬ সালে ইতালির একদল গবেষক এটা নিশ্চিত করেন যে, ছুরিটি একটি উল্কাপিণ্ডের লোহা থেকে তৈরি।
জাপানি গবেষকরা বলছেন, ছুরির ধারালো অংশটি নিয়ে তাদের বিশ্লেষণে এটা নিশ্চিত করা গেছে যে, এর উপাদানের বিন্যাস শুধুমাত্র উল্কাপিণ্ডের অনন্য উপাদানের সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ ইতালির গবেষক দলের সাথে একমত হয়েছেন জাপানের গবেষকরা।

তুতানখামেনের সমাধিক্ষেত্রে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার
গবেষকদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটাই যে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে কিভাবে উল্কাপিণ্ড থেকে এই ছুরিটি বানানো হলো এবং কারা বানিয়েছিলো। ছুরি তৈরিতে ব্যবহার হয়েছে উল্কাপিণ্ডের লোহা। প্রাচীনকালের মানুষ কিভাবে সেই উল্কাপিণ্ডের সন্ধান পেয়েছিলো, সেটিও আরেক রহস্য।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রধর্মের বৈধতা নিয়ে আপিলের শুনানি বৃহস্পতিবার
জাপানের গবেষকরা বলছেন, তারা আরও পরীক্ষানিরীক্ষা চালাবেন। প্রাচীনকালের প্রযুক্তি এবং প্রাচীন মানুষ কিভাবে এই আধুনিক বিদ্যা রপ্ত করলো, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তারা।
তুতানখামেনের জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ১৩৪১ সালে (আনুমানিক)। তিনি ছিলেন মিশরীয় অষ্টদশ রাজবংশের ফারাও। ইতিহাসবিদ মানেটনের মতে, মাত্র নয় বছর রাজত্ব করেছিলেন তুতানখামেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৩২৩ সালে তার মৃত্যু হয়।
একাত্তর/আরবিএস
