বগুড়ায় মাঝপথে যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে বাস রিকুইজিশনের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (২৬ জানুয়ারি) শহরের তিনমাথা নিরালা পাম্প এলাকার বগুড়া-ঢাকা মহাসড়কের প্রথম বাইপাসে এ ঘটনা ঘটে।
দুপুর একটায় সেখানে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, ভরদুপুরে কোলের বাচ্চা আর বউকে নিয়ে মহাসড়কে উদ্বাস্তুর মতো দাঁড়িয়ে আছেন আনোয়ার হোসেন। যাবেন কর্মস্থল ময়মনসিংহে। কিন্তু পথেই বগুড়ার তিনমাথা এলাকায় বাস থেকে তাদের নামিয়ে দিয়েছে পুলিশ। এরপর থেকে প্রায় এক ঘণ্টার মতো এই রাস্তার ওপর সপরিবারে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। আশেপাশে একই কারণে আরও অর্ধশত যাত্রী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। ভোগান্তির শেষ নেই তাদের।

ভোগান্তির শিকার আনোয়ার হোসেন জানান, দিনাজপুর থেকে যেই বাসে চড়ে ময়মনসিংহে যাচ্ছিলেন, প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে পুলিশ সদস্যরা ওই বাসটি জব্দ করে নিয়ে গেছে। বাসে থাকা প্রায় অর্ধশত যাত্রীকে মাঝপথে নামিয়ে দিয়েছে পুলিশ।’
একাধিক বাসের অন্তত জনা পঞ্চাশেক যাত্রীকে দেখা যায় আশেপাশে। কেউ মাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউবা রাস্তার ওপর বসে পড়েছেন। অনেকে রিকশা-ভ্যান খোঁজার চেষ্টা করছেন, যাতে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়।
তেমনি একজন জহুরুল ইসলাম। তিনি পেশায় কাপড় ব্যবসায়ী। পাঁচ সহযোগী নিয়ে তিনি কাপড় বিক্রি করতে দিনাজপুরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বাসে করে টাঙ্গাইলে ফেরার পথে বগুড়ার তিনমাথায় তাদের নামিয়ে দেয় পুলিশ।
জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমিসহ বাসের সব যাত্রীদের নামিয়ে দিয়েছে। বাসের চালক সব কাগজ পুলিশদের দেখিয়ে অনেক অনুরোধ করে। তারপরও স্যারেরা গাড়ি ধরে নিয়ে গিয়েছে। আমিতো মূর্খ মানুষ এত কিছু বুঝি না। ঘণ্টাখানেক হলো দুপুরে প্রচণ্ড রোদের মধ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। ক্ষুধাও লেগেছে অনেক, কিন্তু এই মালামাল নিয়ে কই যাবো এখন।’
ঠাকুরগাঁও থেকে ময়মনসিংহ যাচ্ছিলেন মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী ফারজানা রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি একা মেয়ে মানুষ এক ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে। বাসায় বলার সাহস পাচ্ছি না। জানতে পারলে আব্বু-আম্মু টেনশনে জ্ঞান হারাবে। উনারা সরকারি কাজে গাড়ি জব্দ করবে ভালো কথা, তবে এইভাবে মাঝপথে কেন। এখন কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না। তারা বলেছেন অন্য গাড়িতে উঠিয়ে দিবেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিভাগীয় নির্বাচনী জনসভা। সেখানে নিরাপত্তায় বগুড়া এপিবিএনের সদস্যরা কাজ করবেন। তাদের যাতায়াতের জন্য ছয়টি বাস প্রয়োজন। এ জন্য রাস্তায় যাত্রী নামিয়ে বাসগুলো রিকুইজিশনে জব্দ করছে পুলিশ।
অদূরেই দেখা যায়, বগুড়া জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের দুইজন কর্মকর্তা ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) দুই সদস্য মহাসড়কে ঢাকাগামী বাসগুলো আটকিয়ে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করছেন।
যদিও তিন মাথা থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে বগুড়া কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। টার্মিনালে না গিয়ে রাস্তায় যাত্রী নামিয়ে কেন বাস রিকুইজিশন কেন করা হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, টার্মিনালে পরিবহণ শ্রমিকদের সাথে ঝামেলা এড়াতে রাষ্ট্রীয় কাজের জন্য যাত্রীদের নামিয়ে বাস রিকুইজিশন করা হচ্ছে।
বগুড়ার ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) মাহাবুবর রশিদ জানান, রাজশাহীতে এক সমাবেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আসবেন। সেখানে এপিবিএন সদস্যরা নিরাপত্তা ডিউটিতে যাবেন। তাদের যাতায়াতে ছয়টি বাস প্রয়োজন। এর মধ্যে চারটি বাস ইতিমধ্যে রিকুইজিশন করা হয়েছে।
মহাসড়কে মাঝপথে বাস রিকুইজিশন করায় যাত্রীদের অসুবিধার কথা স্বীকার করে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, সাময়িকভাবে কিছু অসুবিধা হয়েছে যাত্রীদের। তবে পরবর্তী বাসে আমরাই তাদের উঠিয়ে দিচ্ছি। মহাসড়ক ছাড়া টার্মিনালে গিয়ে বাস রিকুইজিশন করা সম্ভব হয় না। সেখানে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে সহযোগিতা করে না।
রাস্তায় যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে বাস রিকুইজিশন করা মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেন বগুড়া জেলা সুজনের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন। তিনি জানান, রাষ্ট্রের অনেক অর্থ আছে, ব্যয়ের খাত আছে। সাধারণ মানুষ কোথাও ভ্রমণ করতে গেলে যেমন গাড়ি ভাড়া করে, তেমনি সরকারি দপ্তরের লোকজনও গাড়ি ভাড়া করে গন্তব্যে যাবে। এ কারণে রিকুইজিশনের ব্যবস্থাটা পরিবর্তন হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি কোনো গাড়িতে নারী ও শিশু যাত্রী থাকে, তা রিকুইজিশনের ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ রয়েছে। কিন্তু তা মানা হয়নি। গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৯ সালে কয়েক দফা নির্দেশনাসহ একটি রায় দেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, নারী, শিশু ও রোগী বহনকারী গাড়ি রিকুইজিশন করা যাবে না।
আরও পড়ুন: কাভার্ডভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানের দোকানে, গ্রাম পুলিশ নিহত
এই রিকুইজিশনের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) হেলেনা আকতার জানান, রাস্তায় যাত্রী নামিয়ে গাড়ি রিকুইজিশন করার কথা নয়। তবে রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশের জন্য এপিবিএন সদস্যরা আগামীকাল রওয়ানা দিবেন। এজন্য গাড়ি জরুরি ছিল। রাষ্ট্রীয় কাজে আমাদের এই কাজ করতে হয়েছে।
একাত্তর/জো
