এমনিতেই রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে ভারতের মণিপুরে। তার ওপরে ধর্ষণের পর দুই নারীকে নগ্ন হাঁটানোর একটি ভাইরাল ভিডিও ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশটির উত্তরাঞ্চল। অগ্নিগর্ভ মণিপুরে দুই কুকি নারীকে প্রকাশ্য রাস্তায় নগ্ন করে ঘোরানোর ভিডিও সামনে আসায় গোটা ভারতও শোকে-দু:খে-রাগে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। ক্ষোভে ফুঁসছে দেশটির নেট দুনিয়া।
এই ঘটনায় ভারতজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বিতর্ক হয়েছে সংসদে। আর সুপ্রিম কোর্ট বলেছে এই ‘চরম সাংবিধানিক ব্যর্থতা’র বিরুদ্ধে সরকার যদি কোনও ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে তারা নিজে থেকেই পদক্ষেপ নেবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংসদ অধিবেশন শুরুর আগে দেয়া এক ভাষণে বলেছেন, ওই দৃশ্য দেখে তাঁর হৃদয় দু:খে ও ক্রোধে ফুঁসছে।
ভারতের মনিপুর রাজ্যে গেলো কয়েকমাস ধরে সহিংস আন্দোলন চলছে। এতে অনেক মানুষ ঘর ছাড়া হয়েছেন। মারা গিয়েছে শত শত মানুষ। ক্ষুব্ধ জনতা আগুন দিয়েছে মন্ত্রী-এমপির বাড়িতে। জাতিগত সংহিতার কারণে মনিপুর কার্যত অগ্নিগর্ভ। কিন্তু এ সহিংসতা থামার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দিন দিন নির্যাতন ও সহিংসতার মাত্রা বাড়ছে। এবং মানুষের মধ্যে হিংসা বাড়ছে।
এবার মণিপুর আরও এক নারকীয় ঘটনার সাক্ষী থাকলো। দুই নারীকে নগ্ন করে রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে কিছু মানুষের বিরুদ্ধে। ওই নারীদের গণধর্ষণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ। অশান্ত মণিপুরের এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেশ জুড়ে নিন্দা-সমালোচনা-ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতার অভিযোগ উঠেছে।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি গ৪ মের। এর আগের দিনই মণিপুরে দুই উপজাতি কুকি ও মেইতেইদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ভিডিওর দুই নারী কুকি সম্প্রদায়ের। রাজ্যের উপজাতি সংগঠন আইটিএলএফ বলেছে, কুকি-জো সম্প্রদায়ের দুই নারীর উপরে অকথ্য নির্যাতন চালায় মেইতেইরা। কাংপোকপি জেলায় এই ঘটনা ঘটেছে। সেই ঘটনার একটি ভিডিও বুধবার সন্ধ্যায় প্রকাশ্যে আসে।
নির্যাতনের শিকার দুই নারীর একজনের বয়স চল্লিশের কোঠায়, অন্যজন তরুণী। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে তীব্র নিন্দায় সরব হয়েছে একাধিক রাজনৈতিক দল। ত্রিপুরার তিপ্রা মথার প্রধান প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেববর্মা টুইট করে বলেছেন, জনজাতিভুক্ত দুই নারীকে নিগ্রহ করা হচ্ছে। দুই জনজাতির মধ্যে সম্পর্ক একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। ঘৃণার জয় হচ্ছে রাজ্যে।
দুই নারীকে বিবস্ত্র করে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার সেই ভিডিওর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে পারেনি দেশটির কোন সংস্থা ও গণমাধ্যম। তবে মণিপুর পুলিশ স্বীকার করেছে, ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওটি জাল নয়– সত্যি। তবে এ ঘটনা গত ৪ মে তারিখের এবং তাতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপহরণ, গণধর্ষণ ও হত্যার মামলাও দায়ের হয়েছে।
আড়াই মাসের পুরনো হলেও বুধবার রাতে ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ওই মামলায় একজনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে রাজ্য পুলিশ।
এদিকে, পার্লামেন্টের অধিবেশনে আর সব কার্যক্রম স্থগিত করে মণিপুর পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি আলোচনার জন্য বিরোধী দলের অন্তত ১৫ জন এমপি মুলতুবি প্রস্তাবও এনেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানিয়েছেন, মণিপুরের দুই নারীর সঙ্গে যা ঘটেছে তা ক্ষমা করা যায় না। ওই ঘটনায় যারা দোষী, তাদের কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হবে।

মণিপুরে সেদিন কী ঘটেছিলো?
বুধবার থেকে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মণিপুরের রাস্তায় কুকি-জোমি সম্প্রদায়ের দু’জন নারীকে নগ্ন করে একদল লোক রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের ক্রমাগত যৌন লাঞ্ছনা করা হচ্ছে।
দু’জন নারীর একজনের বয়স ছিল মাত্র কুড়ি-বাইশ, অন্যজনের চল্লিশের আশেপাশে। ভিডিওতে দেখা যায়, জনতার মধ্যে অনেকেই ওই নারীদের শরীরের বিভিন্ন অংশ খামচে ধরছে। এরপর তাদের জোর করে একটি চাষের ক্ষেতের দিকে টেনে নিয়ে যেতেও দেখা যায়।
পরে ১৮ মে তারিখে ওই ঘটনার যে এফআইআর করা হয়েছে, তাতে ভিক্টিমরা অভিযোগ করেছেন তুলনায় কম বয়সী মেয়েকে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসভাবে গণধর্ষণ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার দিন কাংপোকপি জেলায় তাদের গ্রাম যখন জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন প্রাণে বাঁচতে তারা পরিবারের কয়েকজন মিলে কাছের জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

পথে থৌবাল জেলার একটি পুলিশ ভ্যান তাদের উদ্ধার করে গাড়িতে তুলে নেয়। তবে পুলিশ যখন তাদের থানায় নিয়ে যাচ্ছিল, তখন থানা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে একদল উত্তেজিত জনতা তাদের ঘিরে ধরে। ওই ক্ষুব্ধ জনতা তাদের পুলিশ থেকে ছিনিয়ে নেয়।
নির্যাতনের শিকার এক নারী দাবি করেছেন, পুলিশ আসলে হামলাকারীদের সঙ্গেই ছিল। ওরা বাড়ির বেশ কাছেই প্রথমে আমাদের গাড়িতে তুলে নেয়, তারপর গ্রামের একটু বাইরে গিয়েই রাস্তায় ছেড়ে দেয়। পুলিশই ওই জনতার হাতে আমাদের তুলে দিয়েছিল।
ওই জনতা এরপর জোর করে নারীদের সব জামাকাপড় খুলতে বাধ্য করে। তাদের রাস্তা দিয়ে নগ্ন করে হাঁটানো হয়, এরপর পাশের ধানক্ষেতে নিয়ে গিয়ে যৌন নির্যাতন চালানো হয়। তিনজন নারী ও দুজন পুরুষসহ তারা দলে মোট পাঁচজন ছিলেন, যারা গ্রাম থেকে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। বছর পঞ্চাশের যে তৃতীয় নারী ছিলেন, তাকেও নগ্ন করে ঘোরানো হয়েছিল।

দলের দু’জন পুরুষ ছিলেন সবচেয়ে কমবয়সী নারীটির বাবা ও ভাই। ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় তাদের দুজনকেই হামলাকারীরা হত্যা করেছে বলেও এফআইআরে জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: মহারাষ্ট্রে ভূমিধ্বসে ২০ জন নিহত, নিখোঁজ শতাধিক
গত ৩রা মে থেকে মণিপুরে সংখ্যাগুরু মেইতেই ও সংখ্যালঘু কুকিদের মধ্যে যে রক্তাক্ত জাতি-সংঘাত এবং অবাধ হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগ শুরু হয়েছে, এই ঘটনা ছিল ঠিক তার দ্বিতীয় দিনেরই। তবে এই ঘটনার বীভৎসতা ও নৃশংসতা ঠিক কতখানি ছিল, তা সারা দেশ জানতে পারল ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার আড়াই মাস পর।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা, এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য হিন্দু।
একাত্তর/এসজে
