এখনও আওয়ামী লীগ বিএনপির দ্বিমুখী লড়াইয়ের আসন ঠাকুরগাঁও-১। তবে, ভোটাররা বলছেন, জামায়াত-বিএনপির জোটবদ্ধ নির্বাচন এবং একটি বড় দলের মহাসচিবের ইমেজ এই নির্বাচনের একটি ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করবে। যদিও এখানে ২০০৮ এর নির্বাচনসহ সাতবার জিতেছে আওয়ামী লীগ।
তবে এবার চারজন শক্ত প্রার্থী আসনটি দাবি করায় খানিকটা বিপাকে আছেন তারা। অন্যদিকে নির্বাচনের প্রচারে মাঠে না নামলেও এই আসনে বিএনপির একক প্রার্থী মির্জা ফখরুল। এখন কর্মীরা খেয়াল রাখছেন, জামায়াত প্রার্থী দিচ্ছে কী না, সেদিকে।
ডেটলাইন ঠাকুরগাঁও। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় শ্রী প্রশন্ন বর্মনের বয়স তখন পাঁচ। সেই সময়ের স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেলেও, চোখের সামনে পরিবর্তন হয়েছে নিজ এলাকা। গেলো ৩২ বছর ধরে কাঠ শ্রমিকের কাজ করা প্রশন্ন নিজের পরিবর্তনের গল্পটাকেই দেশের সাথে মেলাতে চান।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনটা সমান ভাবে হয় না। তবে, নিজেদের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করতে চেষ্টার কমতি নেই এই অঞ্চলের মানুষের। সময়ের সাথে সামর্থ বেড়েছে।
২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে পরে এই আসনের সনাতন ধর্মমতাবলম্বীদের বাড়িতে হামলা হয়। হামলা হয় ২০১৮ সালের ভো্টের আগেও। তাই অনেকেই নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে যেতে ভয় পান।
নির্বাচন সামনে। এরই মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মাঠে নেমেছেন। আওয়ামী লীগ- বিএনপি’র প্রভাব এই আসনে সমান সমান। তবে, বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জনপ্রিয়তার আরো বেড়েছে বলে মনে করেন তৃণমূল নেতা-কর্মীরা।
আর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলছেন, উন্নয়ন যা হয়েছে তা রুটিম মাফিক। কৃষি প্রধান এই অঞ্চলে কারখানার সৃষ্টি হয়নি। যার কারণে সারাদেশের মতই অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত এই অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষ। আর তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য মানুষের ভোটাধিকার ফেরাতে চাইছে বিএনপি।
ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। কখনো লড়াই করেছেন আওয়ামী লীগের খাদেমুল ইসলামের সঙ্গে, কখনো রমেশ চন্দ্র সেনের সঙ্গে। দুবার জিতেছেন, হেরেছেন একাধিকবার।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অনেক পরিণত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশের বিভিন্ন বিভাগের সমাবেশে কর্মী-সমর্থকদের জমায়েত করে নজর কেড়েছেন জাতীয় রাজনীতিতে। বিএনপি নির্বাচনে গেলে এবার এ আসনের ভোটারদের নিজের দিকে টেনে নিতে পারেন মির্জা ফখরুল।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা রমেশ চন্দ্র সেন টানা তিনবার ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন। এর মধ্যে ২০০৮ ও ২০১৮ সালে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা ফখরুলকে হারান। এলাকায় তার যথেষ্ট প্রভাবও রয়েছে। প্রবীণ এ নেতার উত্থান-পতনের চক্রে ঘোরার গল্প এই আসন।
গত ১৫ বছরে ঠাকুরগাঁও সদর আসনের নানা উন্নয়নের ফিরিস্তি নিয়ে সামনে এসেছেন আওয়ামী লীগের পাঁচ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী। ফলে কর্মীদের উপর এক ধরণের প্রভাব পরেছে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা ভালো হলেও, সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি নিয়ে আছে নানা জটিলতা। যদিও নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে সব সমস্যার সমাধান হবে।
হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে অন্যতম বর্তমান এমপি সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন। আলোচনায় আছেন ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাদেক কুরাইশী, ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও তিনবারের সাবেক এমপি প্রয়াত খাদেমুল ইসলামের ছেলে সাহেদুল ইসলাম সাহেদ এবং ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট অরুনাংশু দত্ত টিটো।
রমেশ চন্দ্র সেন বলেন, এলাকার মানুষ যদি উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে চায়, তাহলে আমাকে থাকতে হবে। তবে যদি যোগ্য ব্যক্তি পাই, অবশ্যই ছেড়ে দেব। যেহেতু এখানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, তাই এখানে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে রাখতে হবে।
এছাড়, ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে দলটির জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট ইমরান হোসেন চৌধুরী এবং জাতীয় পার্টির (জাপা) জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল রাজি স্বপন চৌধুরী প্রার্থী হতে পারেন। আর এলাকায় জামায়াত ঘাপটি মেরে আছে, আড়ালে প্রচার চালাচ্ছে দলটি।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি প্রার্থী জয়ী হন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ১৯৯৬ সালের সপ্তম, ২০০৮ সালের নবম, ২০১৪ সালের দশম, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হয়। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী বিজয়ী হন। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১১টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে সাত বার এই আসনের নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগ।
একাত্তর/এআর
