১৯৭৩ সালের পর ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো নাটোর-৩ আসনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। বিএনপি কর্মীদের দাবি, চলনবিল ঘেরা সিংড়া উপজেলা তাদের ঘাঁটি। আর, এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক জানান, গেলো ১৫ বছরে বদলে গেছে সিংড়াবাসীর জীবনযাপন। আরও উন্নয়ন পরিকল্পনা দেয়া হয়েছে। উন্নয়নে ভর করেই তিনি আবারও জয়ী হবেন।
সিংড়া উপজেলার কয়রাবাড়ি গ্রামের কৃষক মতলেব প্রামানিক। চলনবিলের মাঝ দিয়ে নির্মিত এই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলছিলেন দুর্গম বিল এলাকার বদলে যাওয়ার গল্প।
দেশ স্বাধীনের পর থেকে সিংড়ার প্রত্যন্ত বিল অঞ্চলগুলোতে পাকা সড়ক তো দূরের কথা, ছিলো না পায়ে হাঁটার পথও। বর্ষায় নৌকা আর শুকনো দিনে গরু মহিষের গাড়ি ছিলো একমাত্রা ভরসা। তবে সম্প্রতি তাদের পালে লাগতে শুরু করেছে উন্নয়নের হাওয়া। ‘বর্ষায় নাও আর কাদায় পাও’- চিরাচরিত এই দুর্ভোগ লাঘব হয়েছে চলনবিলে।
গেলো ১৫ বছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে প্রত্যন্ত এ জনপদ। সিংড়ায় এমন কোনো রাস্তা এখন আর নেই, যা নির্মাণ কিংবা সংস্কার বঞ্চিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, অবকাঠামোসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে।
মুক্তিযুদ্ধের পর, ১৯৭৩ সালে নির্বাচনে সিংড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী। এরপর জাতীয় পার্টি ও বিএনপির দখলে ছিলো এ আসন। ২০০৮ সালের আগে দীর্ঘ ১৮ বছর এই আসন দখলে রাখে বিএনপি-জামায়াত। এরপর ২০০৮ থেকে এখানে জয় পায় আওয়ামী লীগ।
সিংড়ায় নৌকার কাণ্ডারি হিসেবে জুনাইদ আহমেদ পলকের ওপরেই বারবার আস্থা রেখেছে আওয়ামী লীগ। তিনি জানান, গত ১৫ বছরের ধারাবাহিকতায় সিংড়া উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন, চলনবিলে সাড়ে তিনশ’ কিলোমিটার পাকা রাস্তা, শেখ কামাল আইটি সেন্টার, টিটিসি নির্মাণ, বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকারীকরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগসহ বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ভোটাররা তার পক্ষে থাকবেন।
জুনাইদ আহমেদ পলক আরও বলেন, উন্নয়ন ছাড়াও আগামীতে এই আসনে আরও একটি করে উপজেলা, থানা ও পৌরসভা স্থাপনের যে প্রতিশ্রুতি আসছে, তা আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে। এর পরও নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে তৃণমূলের সব পর্যায়ের মানুষের সাথে বেঝাপড়া রয়েছে এমন প্রার্থীকেই বেছে নেয়া প্রয়োজন বলছেন অনেকে।
এদিকে, ১৯৯৫ এর উপ-নির্বাচন থেকে ২০০১ টানা চারবার এই আসনটি ছিলো বিএনপি’র দখলে। এক সময় শক্ত অবস্থান থাকলেও ২০০৮ সালে ভোটের পর সিংড়ায় ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে বিএনপির আধিপত্য। বর্তমানে তা অনেকটাই নিষ্প্রভ। নির্বাচন নিয়ে সংশয় থাকায় দল গোছানোও বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভোটাররা বলছেন, একজন প্রবীণ ও জনপ্রিয় নেতার মৃত্যুর পর তাদের সাংগঠনিক কাঠামো এখন অনেকটাই দুর্বল। যদিও বিএনপির নেতা কর্মীরা এই তথ্য স্বীকার করেন না। তারা মনে করেন, সিংড়ায় তাদের সংগঠন অনেক বেশি শক্তিশালী। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আসন পুনরুদ্ধারেও আশাবাদী তারা।
সিংড়া উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব দাউদার মাহমুদ বলেন, সরকারের দমন-পীড়ন, হামলা-মামলার মুখেই গত এক দশক রাজপথে আছি। গত নির্বাচন কেমন হয়েছে, তা দেশের সব মানুষ জানেন। এবার নির্বাচনে গেলে বিশ্বাস করি দল আমাকেই বেছে নেবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এখানে বিএনপি জয়লাভ করবে।
তবে বিএনপি’র একটি অংশের নেতারা জানান, বিএনপি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তারা পলকের ঘনিষ্ঠ। একজন কাছের আত্মীয় আরেকজন বাল্যবন্ধু। তারা নির্বাচনে কতটুকু বিরোধিতা করবেন তানিয়ে সন্দেহ। যদিও বিষয়টি পাত্তা দেন না স্থানীয় বিএনপির নেতারা। তাদের মত, এই মুহূর্তে বিএনপির প্রধান লক্ষ্য নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন।
আওয়ামী জোটের হয়ে এই আসনে নির্বাচন করতে চান সিংড়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা মিজানুর রহমান মিজান। জোটের মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবার পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি।
জাপার নেতা আনিসুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ বড় দুই দলের রাজনৈতিক লড়াইয়ে অতিষ্ঠ। মানুষ এখন জাতীয় পার্টিকে চায়। জাতীয় পার্টিই দেশের উন্নয়নের সূচনা করেছিল। আশা করি এবারও দল আমাকে মনোনয়ন দেবে। দলীয় মনোনয়ন পেলে আসনটি দলকে উপহার দেব।
এদিকে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখে- স্মার্ট ও আধুনিক সিংড়া গড়ে তুলতে পারবে এমন প্রার্থীর প্রত্যাশাই করছেন এলাকার জনগণ। নাটোর-৩ সংসদীয় আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭ হাজার ৪৬৮ জন। এরমধ্যে নতুন ভোটার ৩১ হাজারের বেশি।
নাটোর-১: আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুদলেই দ্বন্দ্ব প্রকট
নাটোর-২: আওয়ামী লীগের গৃহবিবাদে নির্ভার বিএনপি