অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ধুঁকছে কুড়িগ্রাম-২ আসনের বড় তিন দল। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার দলীয় প্রার্থীর সংখ্যা একাধিক। আওয়ামী লীগেরও মনোনয়ন চাইছেন কমপক্ষে পাঁচজন। বিএনপি থেকে নির্বাচন করতে চান একজন কেন্দ্রীয় নেতাসহ কমপক্ষে তিনজন প্রার্থী। সব প্রার্থীই নিজেদের মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ী উপজেলা নিয়ে কুড়িগ্রাম-২ সংসদীয় আসন গঠিত। কুড়িগ্রামের চারটি আসনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদার এ সদর আসনটি। এর মূল কারণ এই আসনের একটি অংশ জেলা সদরে থাকায়। এজন্য বড় তিন দলের লক্ষ্য এই আসনের দিকে।
এক কালের মঙ্গা এলাকা বলে পরিচিত কুড়িগ্রাম জেলার দৃশ্যপট বর্তমান সরকারের আমলে বদলে গেছে। মঙ্গা নামক শব্দটি এখন জাদুঘরে। কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান ও জায়গা নির্ধারণ, ইকোপার্কের জায়গা নির্বাচন, কুড়িগ্রাম জেলার ৯টি উপজেলায় একটি করে মডেল মসজিদ নির্মাণ, জেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার গৃহহীনদের জন্য জমিসহ একটি করে প্রায় ৪ কিস্তিতে ৫ হাজার ঘর প্রদান, ধরলার দুই তীরে বাঁধ ও নদী খনন রোধের ব্যবস্থাকরণ। এসব কাজ এখন দৃশ্যমান।
কুড়িগ্রাম-২ আসনটি জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবেই পরিচিত। ছয়বার এ আসন দখলে রেখেছে লাঙল প্রার্থীরা। জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদও এই আসনে নির্বাচন করেছেন। ফলে, জনগণের মধ্যে লাঙল প্রতীকের প্রভাব আছে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও তাই হবে বলেই মনে করছেন বর্তমান সংসদ সদস্য পনির উদ্দীন আহমেদ। যদিও দলটি এখন দ্বিধাবিভক্ত।
এই আসনে বর্তমানে জাতীয় পার্টিতেও কোন্দল বেড়েছে। জেলা ও উপজেলায় পাল্টাপাল্টি কমিটির কারণে সাংগঠনিক তৎপরতায় ভাটা পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জেলায় জাতীয় পার্টি বলতেই বর্তমান এমপি পনির উদ্দিন আহমেদ। তিনি তার পছন্দের লোকজনদের দিয়ে তার কর্মকাণ্ড চালান।
জাতীয় পার্টির এমপি পনির উদ্দিন আহমেদ বলেন, আগামী নির্বাচনও মহাজোটের অধীনে হবে। জোটের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। জোট যাকেই মনোনয়ন দেবে আমি তার পক্ষেই কাজ করব। তবে অবশ্যই জাতীয় পার্টি থেকে আমি মনোনয়ন চাইব। আর কোনো অবস্থাতেই আওয়ামী লীগকে ছাড় দেবে না জাপা।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মহাজোট সঙ্গী জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে বিজয়ী করলেও এমপির কাছ থেকে কোনো সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে পারছেন বলে দাবি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের। সরকারি সব বরাদ্দে এমপির একছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
তবে দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির দখলে থাকায় এখানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল। যদিও জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের দখলে। তবে আওয়ামী লীগ এখানেও দুই ভাগে বিভক্ত। মনোনয়নপ্রত্যাশী আছেন কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয় জন।
এই আসনে আওয়ামী লীগ দু’টি গ্রুপে বিভক্ত। এতে বিভক্তি বাড়ছে সাধারণ ভোটারদের মাঝেও। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বড় দলে বিভক্তি খুব স্বাভাবিক। তবে নির্বাচন এলেই বিভক্তি থাকবে না। নেত্রী যাকে মনোনয়ন দেবেন তার পক্ষেই সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।
এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন- সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাফর আলী, সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আমান উদ্দিন আহম্মেদ মঞ্জু, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্রাহাম লিংকন, আওয়ামী লীগ নেতা ও চলচ্চিত্র পরিচালক আবু সুফিয়ান। তারা সবাই যার যার মতো করে গণসংযোগ ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
কুড়িগ্রামের দুই আসনে অবস্থান ভালো থাকলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে বিএনপির জনপ্রিয়তা কমেছে। তৃণমূলের নেতারা জানান, এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা। অন্য গ্রুপে জেলা বিএনপির সভাপতি তাসবিরুল ইসলাম।
এখানে মনোনয়ন চাইতে পারেন দলটির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এছাড়া জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক সোহেল হোসাইন কায়কোবাদের প্রার্থী হওয়াও সম্ভবনা রয়েছে। এদের বাইরে ব্যারিস্টার রবিউল আলম সৈকতের নামও শোনা যাচ্ছে।
চরাঞ্চল অধ্যুষিত এই আসনে নিজেদের আধিপত্য বাড়াচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে এই আসনের একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীর বিজয়কে মাঠ পরীক্ষা হিসেবে নিয়েছে। আগামী নির্বাচন নিয়ে এখনও তাদের তৎপরতা শুরু হয়নি। তারা শুধু দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচনের মাঠ দখলে রাখতে সব দলই এখানে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৯৩ হাজার ৩৩৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২লাখ ৪৩ হাজার ৭৩৮ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ৪৯ হাজার ৫৯৮ জন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে মহাজোট প্রার্থী পনির উদ্দিন আহমেদ বিজয়ী হন।
একাত্তর/আরবিএস
বিএনপির কর্মসূচি নিয়ে ভাবছে না আওয়ামী লীগ, লক্ষ্য সুষ্ঠু নির্বাচন