শেরপুর-১ আসনে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও, বৈষম্যের অভিযোগ করেছেন চরাঞ্চলের ভোটাররা। তারা বলছেন শেরপুর সদরের চরাঞ্চলে থাকা মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা বেহাল। রাস্তা-ঘাট এখনও কাঁচা। আবার যারা রাস্তাঘাটের সুবিধা পাচ্ছেন তারা বলছেন, আগের প্রার্থীদের প্রতিশ্রুত রেললাইন, মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এখনও নির্মাণ হয়নি। ফলে উন্নয়ন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে ভোটারদের মধ্যে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত হলেও তিনটি ভাগে বিভক্ত তারা। খারাপ নয়, জাতীয় পার্টি ও বিএনপির অবস্থাও। হামলা-মামলায় নাজেহাল দলটি চায় আসনটি পুনরুদ্ধার করতে। তবে, তাদের এখনকার লক্ষ্য আন্দোলন চাঙা করা। ভোটারদের প্রত্যাশা, এ আসনে একটি নিরপেক্ষ ভোট হলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মধ্যে তুমুল লড়াই হবে।
শেরপুর জামালপুর সড়ক পাল্টে দিয়েছে গোটা এলাকার চিত্র। ভূমি থেকে অনেকটা উচু এই সড়কটি কেবল এখানকার যোগাযোগের বাধাই দূর করেনি। বন্যার হাত থেকে মুক্ত করেছে পুরো এলাকাকে। কাছে পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ। বর্ষায় নদের পানিতে ভেসে যেতো পুরো এলাকা। পানির নিচে তলিয়ে যেতো শেরপুরের সব কর্মকাণ্ডের অন্যতম অবলম্বন এই সড়কটি। বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো পুরো এলাকা। একটি সড়কের অভাবে বহু বছর ভোগান্তি সইতে হয়েছে শেরপুরবাসীকে। এবার দূর হলো সেই দুর্ভোগ।
তবে এখনও জেলার অন্যান্য সড়কগুলোর বেশিরভাগই কাঁচা। সেই কাঁচা সড়ক ধরেই কৃষিপণ্য নিয়ে সদরে যেতে হয় গ্রামের মানুষকে। তাতে যুক্ত হয় বাড়তি খরচ। কিন্তু পণ্যের ন্যায্য দামতো মেলেনা। ২০১৪ সালে শেরপুর সদরে ২৫ কিলোমিটার রেলপথ বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু গেলো ৯ বছরেও সেই সিদ্ধান্ত আর আলোর মুখ দেখেনি। তাই যোগাযোগের বাধা এখনও রয়ে গেছে।
সদর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত শেরপুর এক আসন। শেরপুর জেলায় নেই কোন সরকারি মেডিক্যোল কলেজ। উচ্চ শিক্ষার জন্য গড়ে ওঠেনি কোন বিশ্ববিদ্যালয়। আসন্ন নির্বাচনে এই না পাওয়া গুলোই অন্যতম অনুসঙ্গ হতে পারে, বলছেন ভোটাররা।
সংসদের গুরুত্বপূর্ণ এ আসনটি আওয়ামী লীগের দুর্গ বলে খ্যাত। সর্বশেষ পাঁচবারই এ আসনে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। এবারও এর ব্যত্যয় হবে না বলে আশা ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের। এ আসনে টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হুইপ বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আতিউর রহমান আতিক। তিনি এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী।
কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা ‘নিরহংকার’ আতিক সাধারণ জীবনযাপনের কারণে এলাকায় রাজনীতিক হিসেবে তার আলাদা একটি ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। পরিচিতি পেয়েছেন ‘মাটি ও মানুষের নেতা’ হিসেবে। কিন্তু এবার তার পথের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছানুয়ার হোসেন ছানু। গতবারের মতোই তিনি এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী।
তবে দীর্ঘ সময় জনপ্রতিনিধি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি থাকায় বিগত স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে রাগ-ক্ষোভ, বিভিন্ন কমিটি গঠন নিয়ে অসন্তোষ ও জেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের ভেতর আতিকবিরোধী একটি বলয় তৈরি হয়েছে। ওই বলয়ের প্রার্থী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. ছানুয়ার হোসেন ছানু। এবার তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় বলয়টিতে চাঙা ভাব এসেছে। কিছু নেতা-কর্মীর ধারণা, দলের সাধারণ সম্পাদকের বিশেষ আশীর্বাদে দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন ছানুয়ার হোসেন ছানু।
জোটের রাজনীতির স্বার্থে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি জাতীয় নির্বাচনে আসনটি জামায়াতকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। তাতেও জয়লাভ করতে পারেনি দলটি। ২০১৮ সালে শিল্পপতি হযরত আলী ঋণ খেলাপির জন্য বাদ পড়লে ধানের শীষের প্রার্থী হন তার মেয়ে সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা। তরুণ প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে বেশ সাড়াও ফেলেছিলেন তিনি। এবারও ডা. প্রিয়াঙ্কাই প্রার্থী হচ্ছেন।
তবে দলীয় নেতা-কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, গত নির্বাচনের পর থেকে নানা দুর্যোগপূর্ণ সময়ে এলাকায় পাওয়া যায়নি প্রিয়াঙ্কাকে। আর এ সুযোগে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন জেলা যুবদলের সভাপতি শফিকুল ইসলাম মাসুদ। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে সম্মানজনক ভোট পাওয়ায় কারণে তিনি মনোনয়ন পেতে পারেন, এমন আশা দলের একটি অংশের।
বিএনপি নেতারা বলছেন, দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে যেহেতু নির্বাচন নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি, তাই তারা আপাতত নির্বাচন নিয়ে ভাবছেন না। বরং তাদের লক্ষ্য এক দফা আন্দোলনে বর্তমান সরকারের পতন। তবে আন্দোলনের পাশাপাশি ভেতরে ভেতরে নির্বাচনী মাঠের দিকে নজর রেখে, প্রস্তুতি নিয়ে রাখার কথাও অস্বীকার করছেন না বিএনপি নেতারা।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায় বিএনপি। তাদের আশা, এবারও বিএনপি প্রার্থীকেই শেরপুর-১ আসন থেকে জোটের মনোনয়ন দেওয়া হবে। তবে মাঠে না থাকলেও গুঞ্জন রয়েছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের পুত্র হাসান ইমাম ওয়াফি জোটগত নির্বাচনের প্রশ্নে শেষটায় প্রার্থী হতে পারেন।
