আসছে ২৪ ফেব্রুয়ারি দুই বছরের গণ্ডি পার হবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধের শুরু থেকে কিয়েভের পাশে দাঁড়িয়েছে ওয়াশিংটন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ‘ইয়ার দোস্ত’ হয়ে পড়েন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। বন্ধুকে সহায়তা দিতে গিয়ে নিজেকে উজাড় করে দেন তিনি।
হাত খুলে ইউক্রেন সামরিক সহায়তা দেয়া ছাড়াও রাশিয়ার উপর স্রোতের মতো নিষেধাজ্ঞা দিতে শুরু করে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমার। জেলেনস্কি যুদ্ধের মধ্যেও উড়ে উড়ে গেছেন সব বন্ধুর কাছে। পেয়েছেনও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা। কিন্তু কথায় বলে, রাজার ভান্ডারও একদিন ফুরায়।
ইউক্রেনকে সাহায্য করতে গিয়ে এখন ফতুর পশ্চিমারা। সবার রাজকোষেই টান পড়েছে। ফলে জেলেনস্কির প্রতি বাড়িয়ে রাখা হাত গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে বন্ধুরা। সবচেয়ে বড় বন্ধু জো বাইডেন নিজেও পড়েছেন বেকাদায়। ইউক্রেনকে আরও অর্থ দিতে চাইলেও বেঁকে বসছে আমেরিকার সিনেট ও কংগ্রেস।

ইউক্রেন বাঁচুক, কি মরুক- কিছুই আর আসে যাচ্ছে না মার্কিন আইন প্রণেতাদের। তাদের কাছে আগে দেশ বাঁচাও, কোষাগারের অবস্থা ভালো নয়। তাই এই অবস্থায় ইউক্রেনকে বাড়তি কোন সহায়তা দেয়া সম্ভব নয়। তাই জো বাইডেনের আনা সব প্রস্তাবকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে দেশটির আইন সভা।
যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে ইউক্রেন। কোনও সন্দেহ নেই মার্কিন অস্ত্রবলেই এ সাহস দেখিয়েছে কিয়েভ। কিন্তু ‘বন্ধু’ দেশকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সাহায্যের জন্য ভাঁড়ারে টান পড়েছে ওয়াশিংটনের। অতিরিক্ত সহায়তা বন্ধের পক্ষেই সরব হয়েছেন সে দেশের বহু জনপ্রতিনিধি।
আর এতে করেই মায়া কান্না শুরু করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। বাইডেনের আশঙ্কা, যদি কিয়েভকে সামরিক সাহায্য করা বন্ধ করে দেয় মার্কিন প্রশাসন, তাহলে জয় হবে রাশিয়ার। মঙ্গলবার তিনি হাউসকে জানান, সহায়তা না পেলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইউক্রেন দখলে নেবে রাশিয়া।
বাইডেনের এমন কথায় নড়েচড়ে বসেছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাদের প্রশ্ন, তাহলে কি এমন মায়া কান্না করার মাধ্যমে কি হাড়ির খবরই দিয়ে দিলেন বাইডেন। একেবারে অমূলক নয়, মঙ্গলবার বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ১৩৯টি বাড়িসহ ইউক্রেনের দুই শতাধিক স্থানে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।

রয়টার্স বলছে, হোয়াইট হাউসের এক সম্মেলনে মার্কিন কংগ্রেসের কাছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়। করজোড়ে আর্জি জানিয়ে বলা হয়, যদি আমেরিকা বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, সাঁজোয়া গাড়ি ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কিয়েভকে দেওয়া বন্ধ করে দেয় তাহলে তার পরিণতি ভয়ংকর হবে।
আরও আশঙ্কা করা হয়, যুদ্ধে এগিয়ে যাবে রাশিয়া। ধরাশায়ী হবে ইউক্রেন। তাই মিত্রদেশকে সাহায্য করার জন্য আরও ৬০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের অনুরোধ জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। যা নিয়ে কংগ্রেসের ভেতরে টানাপোড়েন চলছে। ইউক্রেনকে আরও সাহায্য করা নিয়ে বিরোধিতা করেছে রিপাবলিকানরাও।
ইউক্রেনকে বেহিসাব সামরিক সহায়তা দিয়ে গিয়ে চাপে পড়েছে আমেরিকার অর্থনীতি। এই সহায়তা নিয়ে আমেরিকার ভেতরেই চরম অসন্তোষ। এমনিতেই মুদ্রাস্ফীতিতে হাবুডুবু জো বাইডেনের দেশ। এ অবস্থায় ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থসাহায্য বন্ধের পক্ষেই আওয়াজ তুলেছে দেশটির জনপ্রতিনিধিরা।
সম্প্রতি রয়টার্স-ইপসোস প্রকাশিত এক রিপোর্ট বলা হয়েছে, ইউক্রেনকে সামরিক দেয়ার বিষয়ে আমেরিকার প্রধান দুই রাজনৈতিক দলে সমর্থন কমে আসছে। যা কিয়েভের জন্য সতর্কবার্তা। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের সবথেকে বড় অস্ত্র সরবরাহকারীদের মধ্যে অন্যতম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
ওই সমীক্ষায় অংশ নেয়াদের মধ্যে ৪১ শতাংশ মনে করেন আমেরিকার উচিত ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করা। ৩৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী দ্বিমত পোষণ করেছেন এবং বাকিরা উত্তর দেননি। ফলে এই মার্কিন প্রশাসনের এই টালবাহানায় চিন্তার ভাঁজ পড়ছে ইউক্রেন তথা জেলেস্কির কপালে।
কিয়েভের কপালে যখন চিন্তার ভাঁজ, তখন অন্যদিকে মোচে তা দিচ্ছেন রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিন। এর কারণও আছে। পশ্চিমার একজোট হয়েও কিছুই করতে পারেনি। বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরও রাশিয়ার অস্ত্রভান্ডারে চাপ যেমন পড়েনি, তেমনি দেশের অর্থনীতিও রয়েছে বেশ চাঙ্গা।
