প্রজ্ঞাপন দিয়ে কৌশলে পোশাক রপ্তানির প্রণোদনা বন্ধ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, এমন অভিযোগ গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএয়ের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগের মুদ্রানীতিতেই বর্তমান প্রণোদনা চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বহাল থাকার কথা ছিলো বলছেন তারা। অভিযোগ, কোন প্রকার আলোচনা ছাড়াই প্রণোদনা কমানোয় সব রপ্তানিকারকই ক্ষতির মুখে পড়বে।
রপ্তানিতে পণ্য ভেদে এখন সর্বোচ্চ ২০ এবং সর্বনিম্ন ১ শতাংশ প্রণোদনা পান ব্যবসায়ীরা। যদিও ২০২৬ সালে এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ডব্লিউটিও’র নীতি অনুযায়ী কোন খাতই রপ্তানিতে প্রণোদনা পাবে না।
এরই প্রস্তুতি হিসেবে এলডিসি গ্রাজুয়েশন দুই বছর আগেই নতুন মুদ্রা নীতির দোহাই দিয়ে রপ্তানি পণ্যে বিভিন্ন হারে প্রণোদনা কমানোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, একদিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি অন্যদিকে ক্রয়াদেশও কম, এমন অবস্থায় এমন সিদ্ধান্ত পোশাক শিল্পকে বিপর্যয়ে ফেলবে।
ইভিন্স গ্রুপের পরিচালক শাহ্ রাঈদ চৌধুরী বলেন, আমি স্বাভাবিকভাবে সামনে নতুন প্রোডাক্ট ডেভলপের চিন্তার করবো না। ফলাফলে রপ্তানি কমবে।
গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে গত বছরের এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিলো এবার জুন পর্যন্ত রপ্তানি প্রণোদনা অপরিবর্তিত হারে বহাল থাকবে। কিন্তু কোন আলোচনা ছাড়াই নতুন প্রজ্ঞাপনে কমানোসহ সুকৌশলে পাঁচ ধরনের পোশাকে সম্পূর্ণ প্রণোদনাই নেই হয়ে গেলো। যার আওতায় পড়ে মোট পোশাক শিপমেন্টের ৫৫ শতাংশ, এর রপ্তানি মূল্যে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এস এম মান্নান কচি বলেন, বলা হচ্ছে পাঁচটি আইটেমকে প্রণোদনার আওতা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ফলে আগে রপ্তানিতে আমরা যে প্রণোদনা পেতাম এখন তার ৭০ শতাংশই পাওয়া যাবে না।
প্রণোদনা প্রত্যাহারের এখন উপযুক্ত সময় নয় বলে বিবৃতিও দিয়েছে বিজিএমইএ। তবে এই অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন এলডিসি গ্রাজুয়েশনের প্রস্তুতি হিসেবে ধীরে ধীরে প্রণোদনা তুললে কোন খাতে কি অভিঘাত হয় তা আগাম জানা যাবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, ব্যবসায়ীদের ঘোষণার সাথে মিলিয়ে ভবিষ্যতে সরকারের সাথে এসব নিয়ে আলোচনা করা উচিত।
পাশাপাশি প্রণোদনার বিকল্প হিসেবে বাজেটে রপ্তানিমুখী খাতকে অন্যভাবে সুবিধা দেয়া যায় কিনা সেটি ভেবে দেখার পরামর্শও দেন এই অর্থনীতিবিদ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে জানিয়েছে যে, তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি পণ্যের উপর সরকারি নগদ প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হবে।
৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে মোট ৪৩টি খাতে রপ্তানির বিপরিতে প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। তৈরি পোশাক খাত ছাড়াও এর আওতায় রয়েছে, পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি খাত, চামড়াজাত দ্রব্য, হাতে তৈরি পণ্য, হিমায়িত চিংড়ি, নানা ধরণের কৃষিপণ্য, হাল্কা প্রকৌশল পণ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য, হিমায়িত পণ্য, রাসায়নিক পণ্য ইত্যাদি।
চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে অল্প অল্প করে এই প্রণোদনা কমিয়ে আনা হবে।
সার্কুলারে বলা হচ্ছে, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটতে যাচ্ছে। উত্তরণ পরবর্তী সময়ে রপ্তানি প্রণোদনা একবারে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা হলে রপ্তানি খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সেই বিবেচনায় অল্প অল্প করে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ যেহেতু ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাবে, তাই এই প্রণোদনা প্রত্যাহার করতে হবে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, কোনও দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে গেলে তারা কোনও রপ্তানি প্রণোদনা দিতে পারে না।
বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্পের বিভিন্নখাতে বিভিন্ন হারে প্রণোদনা দেওয়া হয়। এগুলো হচ্ছে, শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাক এর পরিবর্তে ৩%, ইউরো অঞ্চলে বস্ত্র খাতের রপ্তানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত ১%, নীট, ওভেন ও সোয়েটার খাতের সব ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য অতিরিক্ত ৪%, নতুন পণ্য বা বাজার সম্প্রসারণ সহায়তা হিসেবে ৩% এবং তৈরি পোশাক খাতে ০.৫০% হারে বিশেষ নগদ সহায়তা।
এছাড়া তৈরি পোশাক খাতে সব বাজারে সব পণ্যের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ১ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়া হয়।
সরবরাহ সংকটের অজুহাতে আবারও বেড়েছে পেঁয়াজের দাম
অপ্রচলিত বাজারে বেড়েছে পোশাক রপ্তানি
কমানো হলো রপ্তানি সহায়তা 