ভোক্তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ শুরু করে পর্যায়ক্রমে সবার টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ রাসেল।
রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে এক অনুষ্ঠানে ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেছেন, অসুস্থ প্রতিযোগিতা নয়, স্বচ্ছ প্রক্রিয়াতে ব্যবসা করে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেবে ইভ্যালি।
অনলাইনে কম দামে পণ্য দেয়ার নামে প্রতারণার অভিযোগে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ইভ্যালিকে এক সময় বন্ধ করে প্রশাসক বসিয়ে দেয় সরকার । প্রতিষ্ঠানটির কাছে পাওনাদারের পরিমাণ অনেক থাকলেও মাত্র ছয় হাজার অভিযোগ জমা পড়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে।
সেখানে থেকে দেড়শো অভিযোগকারীর ১৫ লাখ টাকা ফেরত দিতে এসে ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী বলেন, আগের সব ভুল শুধরে বর্তমানে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ব্যবসা করছেন তিনি। এটি চলমান থাকলে আগামীতে সব গ্রাহকদের টাকাও ফেরত দিতে পারবেন।
ইভ্যালির সিইও মোহাম্মদ রাসেল বলেন, গত এক মাসে ইভ্যালি ব্যবসা করে কমিশনের মাধ্যমে যে টাকা আয় করেছে, বিভিন্ন খরচ বাদ দিয়ে সেই আয়ের লাভের টাকা থেকে আজ ১৫০ জনের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। গত এক মাসে আমরা ৬৫ হাজার অর্ডারের পণ্য ডেলিভারি করেছি।
বর্তমানে ইভ্যালির ব্যবসার প্রক্রিয়া খুবই স্বচ্ছ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এখানে কোনো ধরনের প্রতারণার আর সুযোগ নেই। আমাদের এখন অর্ডার প্রসেসটা হচ্ছে ক্যাশ অন ডেলিভারি। অর্থাৎ পণ্য হাতে পেয়ে আপনি টাকা দেবেন। এখানে কোনো অর্থ পণ্য পাওয়ার আগে আমাদের কাছে আসার সুযোগ নেই।
রাসেল বলেন, আমরা শুধু অভিযোগকারীদের অভিযোগ নিষ্পত্তি নয়, যারা অভিযোগ করেনি, তাদের টাকাও আমরা ফেরত দেবো। এবার এটা মার্চেন্ট হোক বা ক্রেতা। ইভ্যালি যদি ব্যবসা করতে পারে তাহলে যত দেনা আমাদের আছে, সেটা আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে পারবো। এ মাসের তৃতীয় বা চতুর্থ সপ্তাহে আমরা আরেকটি পর্যায়ের অভিযোগ নিষ্পত্তি করে টাকা ফেরত দেবো।
ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর মহাপরিচালক আশা করেন প্রতিশ্রুতি মেনেই আগামীতে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিবে ইভ্যালি, তবে অন লাইন কেনাকাটা প্রতারিত না হতে ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ভোক্তা অধিকারের মহাপরিচালক সফিকুজ্জামান বলেন, ই-কমার্সকে আমরা ঠেকিয়ে রাখতে পারবো না। ই-কমার্স এগিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে গেলে অবশ্যই ই-কমার্সের বিস্তার ঘটাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ই-কমার্স বিষয়ে প্রায় ১১ হাজার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে একটি বড় অংশ ইভ্যালির বিরুদ্ধে। ইভ্যালির রাসেল ২৭ মাস জেলে ছিলেন। তার যদি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়, তাহলে এ অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি হবে না। যে টাকা গ্রাহকের কাছ থেকে চলে গেছে, সেগুলো তারা ফেরত পাবেন না। তাই তাদের (ইভ্যালি) ব্যবসায় ফিরে আসার সুযোগ করে দিতে হবে।
ই-কমার্স থেকে কেনাকাটায় ভোক্তার সচেতনতা প্রয়োজন উল্লেখ করে সফিকুজ্জামান বলেন, ভোক্তারা যতক্ষণ পর্যন্ত সচেতন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এমন প্রতারণা চলবে। তাই ভোক্তাদের উচিত কোন সাইট প্রকৃত, কোনটা প্রকৃত নয় সেটি দেখেশুনে কেনাকাটা করা।
টাকা ফেরত পাওয়া কয়েকজন গ্রাহক বলেন, প্রতারণা এবং হয়রানি বন্ধে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের জন্য আইন এবং জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
ভোক্তার মহাপরিচালকও জানিয়েছেন, অনলাইনের জন্য এরই মধ্যে একটি বিধি তৈরি করা হয়েছে।
বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পণ্য না দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে দেরি করার কারণেই সমালোচিত হতে শুরু করেছিলো ইভ্যালি।
এক মাসের মধ্যে পণ্য দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক গ্রাহক, সরবরাহকারী (সাপ্লাইয়ার), মার্চেন্ট পণ্য বা অর্থ বুঝে পেতে অপেক্ষা করছিলেন বছরের পর বছর। অপেক্ষাকৃত পুরোনো গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ৫০ শতাংশ ছাড়ে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে নতুন গ্রাহককে আকৃষ্ট করার কৌশল ছিলো ইভ্যালির।
ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রাহকের করা প্রতারণা মামলায় রাসেল-শামীমা গ্রেপ্তার হন। অনিরীক্ষিত হিসাবে তখন ইভ্যালির কাছে প্রতারিত গ্রাহকের পাওনা প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এর বাইরে মার্চেন্ট ও সাপ্লাইয়ারদের পাওনা মিলিয়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার দায়ে পড়ে যায় কোম্পানিটি।
ইভ্যালির পুনর্গঠন হিসাব-নিকাশের সুবিধার্থে তার স্ত্রী শামীমাকে এক বছরের মাথায় শর্ত সাপেক্ষে জামিন দিয়েছিল আদালত। আর রাসেল মুক্তি পান গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর।
গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ও পরে এই দম্পতির বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতি ও অন্যান্য প্রতারণার দায়ে দেশে সাড়ে ৩০০ এর অধিক মামলা হয়েছিলো। এসব মামলার মধ্যে বেশ কয়েকটিতে রাসেলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
