ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকটের মধ্যে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে বেশ কিছু হামলায় পেছনে রয়েছে তার হাত। অথচ সেই ইসমাইল ঘানির নামটাই শোনেনি অনেকে। অদৃশ্য থেকেই ইরানের শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছেন তিনি। পূর্বসূরি জেনারেল কাসেম সোলেইমানির মতো তিনিও থাকেন নিভৃতে। এড়িয়ে চলেন জনসমাগম। তবে ইরানের শক্তিমত্তার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। কাসেম সোলেইমানির পর তেহরানের সবচেয়ে বড় বীর হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে ঘানিকে।
কে এই ইসমাইল ঘানি? গোটা বিশ্বের কাছে সমীহ জাগানো ইরানের বিপ্লবী গার্ডের অপ্রচলিত যুদ্ধ শাখা কুদস বাহিনীর প্রধান তিনি। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেহরানের মিত্র ও প্রতিনিধিদের নেটওয়ার্ক সমন্বয়ের দায়িত্ব তার কাঁধেই আছে বল পশ্চিমারা মনে করে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে বেড়ে যায় কুদস সমর্থিত বাহিনীর আক্রমণ। এরপরই ঘানির দিকে দৃষ্টি ফেরায় গণমাধ্যম। কিন্তু তিনি নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতেই পছন্দ করেন, যেমনটা করতেন তার পূর্বসূরী কাসেম সোলাইমানি।
নব্বই দশকের শেষের দিকে শুরু হওয়া কুদস বাহিনীর কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন ঘানি। সোলেইমানির মৃত্যুর আগের বছরগুলোতে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসেন এই কমান্ডার। সোলেইমানির সহকারী হিসেবেই কাজ করতেন ইসমাইল ঘানি। ১৯৮০ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর থেকে এক সঙ্গে কাজ শুরু করেন দু’জন। এরপর থেকে ঘনিষ্ঠ হতে থাকেন তারা। সোলেইমানির মৃত্যুর পর ঘানিই তার যোগ্য প্রতিনিধি হবেন বলে আগেই ধরে নিয়েছিলো সবাই।

ব্যক্তিত্ব ও প্রচারের দৃষ্টিভঙ্গিতে সোলেইমানি এবং ঘানি দুজনই ভিন্ন। তারপরও সোলেইমানির ২০ বছরের স্বপ্নকে বিস্তৃত করতে চেষ্টা করতে কোন কার্পণ্য করেননি ঘানি। তার অধীনে কুদস বাহিনী ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ফিলিস্তিনি অঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন এবং অর্থায়ন বাড়িয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ। প্রতিরোধের অক্ষ তৈরিতে ইরানের অধীনে সোলেইমানির পর ঘানির অবদান সবচেয়ে বেশি। গুরুর পথ ধরেই এই অঞ্চলের বিবদমান গোষ্ঠীগুলোতে এক করতে ভূমিকা রাখছেন।
সোলেইমানির মতোই ঘানিও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পূর্ণ আস্থা ও সমর্থন অর্জন করেছেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ঘানির অগ্নিদৃষ্টির সামনে বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ চাপের মুখে ইরানের শত্রুরা। বিশেষজ্ঞরা জানান, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থাৎ কুদস বাহিনীর বিশেষ যুদ্ধকৌশল এই অঞ্চলের নিরাপত্তার ভূ-চিত্র পরিবর্তন করেছে। এটি অক্ষের মধ্যে থাকা গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ইরানের শত্রু ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তৈরি করেছে ব্যাপক চাপ।

আরও মনে করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘানির আরও শক্তিশালী হাত রয়েছে। গেলো জানুয়ারিতে জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা করে ইরাকভিত্তিক ও ইরান সমর্থিত ইসলামিক প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো। এর ফলে তৈরি হয় ব্যাপক উত্তেজনা। ইরাক, সিরিয়ায় মার্কিন ও ব্রিটিশদের উসকে দেয় এই হামলা। গণমাধ্যমে বলা হয়েছিল, ইরাকি গোষ্ঠীগুলোকে সাময়িকভাবে মার্কিনবিরোধী হামলা বন্ধ করার জন্য চেষ্টা চালান ঘানি। তবে এই বিরতি স্থায়ী হয় কি-না তা সময় বলে দেবে।
ইসরাইল, ইরাক ও ইয়েমেনের বাইরেও লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে কুদস বাহিনীর সম্পর্ক তৈরিতে চেষ্টা করেছেন ঘানি। কারণ, হিজবুল্লাহ ‘প্রতিরোধের অক্ষে’ ইরান সবচেয়ে শক্তিশালী অংশীদার। এ অঞ্চলে মার্কিনিদের জন্য রীতিমতো হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে তারা। গেল ৭ অক্টোবরের পর থেকে প্রতিদিনই সংঘর্ষে জড়িয়েছে হিজবুল্লাহ। ইসরাইলের সঙ্গে বড় এক যুদ্ধে জড়াতে ইচ্ছুক হিজবুল্লাহর সাধারণ সম্পাদক হাসান নাসরাল্লাহ । তিনি আক্রমণ বন্ধ না করলেও বর্তমানে কমেছে হামলার তীব্রতা।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ইসরাইলের দোসর আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কিনা, তা নিয়ে চিন্তায় আছেন হিজবুল্লাহ প্রধান নাসরুল্লাহ, ঘানি ও খামেনি। তবে হিজবুল্লাহ সম্পর্কে ঘানির যে কোনো বক্তব্য তৈরি করতে পারে উত্তেজনা। খামেনির সমর্থন নিয়ে ঘানি কুদস বাহিনীর মাধ্যমে ইরানের স্বার্থকে এগিয়ে নিতে সফল হবেন কি না তা সময়ই বলে দিবে। তবে তিনিই যে ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র, সেটা মানছেন সবাই।
জলদস্যুতা নির্ভর যে দেশের অর্থনীতি!
ত্রাণ নিতে গিয়ে গুলিতে নিহত বহু ফিলিস্তিনি