প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে রাস্তা। অবাক শোনালেও সত্যি, ঢাকার রায়েরবাগে পরীক্ষামূলকভাবে এমন একটি রাস্তা তৈরি হয়েছে। এ রাস্তা তৈরিতে সড়ক পরিবহন বিভাগকে সহায়তা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আর্লিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি গবেষক ড. শাহাদাত হোসেন।
রাস্তাটি তৈরির কাজে যুক্ত সবাই বললেন, পরীক্ষামূলক এ উদ্যোগ টেকসই হলে, দেশের সড়ক সংস্কারে অর্থের অপচয় কমাবে।
ঘর থেকে বাজার কিংবা রাস্তা; সকাল থেকে রাত। আমাদের নিত্যদিনের জীবনের সাথে জড়িয়ে জড়িয়ে গেছে প্লাস্টিক পণ্য।এর একটি বড় অংশই পলিথিন। যা ব্যবহৃত হয় পণ্যের মোড়ক তৈরি ও বিপণনে।
দেশে বছরে প্রায় সাড়ে আট লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। এই বর্জ্যের ৭৩ শতাংশই পলিথিন। ৪০ শতাংশ বর্জ্য রিসাইকেল বা পুনঃব্যবহার হয়। বাকিটা পরিবেশের দূষণ ঘটায়। বিশ্বের মোট প্লাস্টিক দূষণের ২ দশমিক ৪৭ শতাংশই ঘটে বাংলাদেশে।
প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা আর কর্ণফুলীর মতো নদীগুলো আজ দূষণের শিকার। খাল নালা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার কারণও এই পলিথিন। প্লাস্টিক বর্জ্য মাছ ও বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে ঢুকে সেগুলো আবার ফিরে আসছে মানুষের দেহে। তৈরি করছে নানা প্রাণঘাতি রোগ।

কিন্তু প্লাস্টিক বর্জ্যকেও যে সম্পদে পরিণত করা সম্ভব তার প্রমাণ এই রাস্তাটি। রায়ের বাজারে গেল সেপ্টেম্বরে এই রাস্তা চালু হয়েছে। এটি তৈরিতে সড়ক পরিবহন বিভাগকে সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস আলিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ। যার নেতৃত্বে আছেন বাংলাদেশি উদ্ভাবক ড. শাহাদাত হোসেন। তার নেতৃত্বে টেক্সাসেও এমন রাস্তা তৈরি হয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে রাস্তা তৈরির এই ধারণা সম্পর্কে বললেন এই অধ্যাপক।
যুক্তরাষ্ট্রের আলিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শাহাদাত হোসেনে বলেন, আমি টেক্সাস ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টেশনে গিয়ে বললাম, এমনও একটা আইডিয়া আছে আমি রাস্তায় বিটুমিনের যায়গায় প্লাস্টিক ব্যবহার করতে চাই। দুই বছর পর আমরা ল্যাবে কাজ করে যে ফলাফল দেখলাম, তা অবাক করার মতো ছিলো।
তিনি আরও বলেন, এর ফলে রাস্তার ক্র্যাক বা ফাটল অনেক কমে গেলো। হিট রেজিস্টেন্স বেড়ে গেলো। এবং বাংলাদেশের কথা চিন্তা করে আমরা যখন বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে পরীক্ষা করলাম, দেখলাম বন্যার পরও রাস্তা ভাঙছে না।
সড়ক গবেষণা কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে এই রাস্তা নির্মাণের সাথে যুক্ত দুই প্রকৌশলী জানালেন কীভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে এটি তৈরি হলো।

বাংলাদেশ সড়ক গবেষণাগারের পরিচালক ড. আহসান হাবীব বলেন, বাংলাদেশের রাস্তার বর্জ্যকে রিসোর্স হিসেবে কোথাও ব্যবহার করা যায় কিনা, এটার সেরা সমাধান হচ্ছে রাস্তা। আমরা যেহেতু পলিমার মডিফাইড নিয়ে কাজ করছি, তাহলে প্লাস্টিক নয় কেন? সেই কনসেপ্ট থেকে আসলে আমরা প্লাস্টিকটাকে রাস্তায় ব্যবহার করার চিন্তাভাবনা করছি।
বাংলাদেশ সড়ক গবেষণাগারের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীমা ইয়াসমিন বলেন, পাথর বা বিটুমিন এসব অনেকেটাই আমাদের আমদানি করতে হয়। প্লাস্টিকের ব্যবহার একটা বিরাট সম্ভাবনা।
বাংলাদেশে রাস্তার প্রধান শত্রু অতি তাপ ও অতি বৃষ্টি। এ কারণে প্রতি বছরই হাজার কোটি টাকার সড়ক মহাসড়ক নষ্ট হয়। এটি সেই সমস্যার সমাধান দিতে পারে।
অধ্যাপক ড. শাহাদাত হোসেন বলেন, ক্লাইমেট ইফেক্ট কমানোর জন্য প্লাস্টিকের রাস্তা খুবই কার্যকারী। এখন যদি বাংলাদেশে প্রতিবছর রাস্তা মেরামত করতে হয়। মেরামতের সময়টা এক বছর থেকে পাঁচ বছর। আমাদের ল্যাবে যেটা টেস্ট করেছি, ল্যাবে সিমুলেট করতে পেরেছি ১২ বছর পর্যন্ত।
কিন্তু এমন রাস্তা কি নতুন কোনো পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে?
এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিক রোদ থেকে যে মাইক্রোপ্লাস্টিক লেসিং হবে। পরিবেশে তার খুবই কম প্রভাব পড়বে।
কেবল রাস্তা নয়। ঝড় বন্যায় বাঁধ ও রাস্তা ভাঙার সমাধানও দেখাচ্ছে এই প্লাস্টিক বর্জ্য। একই পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মাণ হলে সেটিও টেকসই হবে বলে মনে করা হচ্ছে। টেক্সাসে এটির সফল পরীক্ষাও হয়েছে।
ড. শাহাদাত হোসেন, ২০১৯ সালে আমি ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডে কথা বলি। প্লাস্টিক রোডের জন্য নয়, প্লাস্টিক পিল দিয়ে বেড়িবাঁধ কীভাবে করা যায়। পানিতে যাতে ভেসে না যায়।
বিদেশে থেকে দেশ সম্পর্কে হতাশা না ছড়িয়ে দেশের জন্য কিছু করার মানসিকতা থেকেই কাজটি করেছেন, বললেন ড. শাহাদত।
বিশ্বের সবচেয়ে দামি শহর হংকং, ঢাকার স্থান কোথায়?
পদ্মাসেতু নির্মাণের বরাদ্দ থেকে ১,৮৩৫ কোটি সাশ্রয় 