শোকে মাতম চলছে ঢাকায় নিহত ছাত্রলীগ নেতা সবুজ আলীর বাড়ি নীলফামারীতে। ছেলেকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন সবুজ আলীর মা সূর্য্য বানু।
নিহত সবুজ আলী নীলফামারী সদর উপজেলা চওড়া বড়গাছা ইউনিয়নের আরাজী দলুয়া বাংলাবাজার গ্রামের আব্দুর রহিম বাদশা মিয়া এবং সূর্য্য বানু দম্পতির তৃতীয় ছেলে। বুধবার দুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় সবুজের মা। জরাজীর্ণ ঘরের বিছানায় শুয়ে ছেলেকে নিয়ে প্রলাপ করছেন তিনি।
‘আমার পুত কো, আমার বেটা কো। দয়াল আল্লাহ আমার বেটাক দেও গো, আমার কাছে ফিরাই দেও। ও বাবারা আমার বাবাটাক আইনা দেও। আমার বেটাক আইনা দেও বাবা। আমি কত দুঃখিনী মাও, আমি কত দুঃখ-কষ্ট কইরা বেটাক লেখাপড়া করাইছি। আমার বেটাক দেও গো আমার বেটাক’, আহাজারীর সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।
সবুজের বাবা আব্দুর রহিম বাদশা পেশাভ্যানচালক এবং সূর্য্য বানু কখনো কাজ করেন অন্যের বাড়িতে আবার কখনো করেন ভিক্ষা। দুজনের সামান্য আয়ে ছেলেকে পড়াচ্ছিলেন ঢাকা কলেজে। স্বপ্ন দেখছিলেন ছেলে লেখাপড়া শিখে একটি ভালো চাকরিতে প্রবেশ করে ধরবে সংসারের হাল। কিন্তু নিমিষেই সেই স্বপ্ন নিভে গেল বাবা-মায়ের।
স্থানীয়রা জানান, একমাত্র বাড়ির ভিটের আটশতক জমি ছাড়া তেমন কোন সম্পদ নেই সবুজদের পরিবারে। বাবার ভ্যান চালানোর আয়ে চলে তাদের পরিবার। চার ভাই এক বোনের মধ্যে সবুজ আলী তৃতীয়। সবার বড়ভাই সুজাব আলী একজন প্রতিবন্ধী। মেজভাই নূর নবী ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করে কিছুটা যোগান দেন সংসারে। একমাত্র বোন বাছিরণ বেগমের বিয়ের হয়েছে। সবুজ আলী ঢাকা কলেজে পরিসংখ্যান বিভাগে অনার্স শেষে ভর্তি হয়েছেন মাস্টার্সে। তার ছোট ভাই শাহ সুলতান নীলফামারীর পাশ্ববর্তি পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ সরকারি কলেজে পড়েন একাদশ শ্রেণীতে। সে কিছুটা মানসিক প্রতিবন্দ্বী।
বুধবার দুপুরে জেলা শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে সবুজ আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে শোকের মাতম চলছে পরিবারের মাঝে। ছেলের শোকে মা সূর্য্য বানু শয্যাশায়ী। ছেলের স্মৃতিতে মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল নানা প্রলাপ। তার বাবা আব্দুর রহিম বাদশা নেই বাড়িতে।
প্রতিবেশীরা জানান, দুই মাস আগে ছেলে সবুজের টাকার প্রয়োজন হওয়ায় জীবীকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বনের ভ্যানটি বিক্রি করে যে টুকু টাকা পেয়েছিলেন তা সবুজকে পাঠিয়েছেন সবুজের বাবা। এখন জীবন-জীবীকার তাগিদে তিনি শ্রমিকের কাজে রয়েছেন ঢাকার মানিকগঞ্জ জেলায়। সবুজের মৃত্যুর খবর বাড়িতে এলওে মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না তার বাবাকে।
তিনি আরও বলেন, আহারে কইলজার টুকরা, মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ কইরা, ভিক্ষা কইরা খিলায়া আমি সন্তানের লেহাপড়া করাইছি গো। আমার এই সন্তানের বিচার আমি চাই, ন্যায্য বিচার আমি চাই। আমার সন্তানকে কি করলো, আমার সন্তান আমি চাই, আমার বেটা চাই। আমার সন্তান কোনদিন গ্রামে নারাই করে নাই, আমার সবুজ শান্ত।
সবুজের ছোট ভাই শাহ সুলতান জানান, গত ১৩ জুলাই সকাল পৌনে আটটার দিকে শেষ কথা হয়েছিল পরিবারের সঙ্গে ভাইয়ের। সেদিন নিজে ফোন করে মাসহ সবার খোঁজখবর নিয়েছেন। জানিয়েছিলেন ভালো থাকার কথা।
চওড়াবড়গাছা ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজুল ইসলাম বলেন, সবুজ আলী আমার প্রতিবেশী। তার বাবা ভ্যান চালিয়ে অনেক কষ্টে ছেলের লেখাপড়ার খরচ যোগান দিচ্ছিলেন। ছেলের মাস্টার্স ভর্তির টাকার প্রয়োজনে গত দুইমাস আগে সে ভ্যানটি বিক্রি করে দেন। এরপর সংসার চালাতে দিনমজুরীর কাজে বর্তমানে রয়েছেন মানিকগঞ্জ জেলায়। ছেলের মৃত্যুর খবর দেওয়ার জন্য আমরা মোবাইলে তাকে চেষ্টা করে পাচ্ছিনা।
তিনি বলেন, সবুজ শান্ত স্বভাবের। এলাকায় তাকে সকলে ভালো ছেলে হিসেবে চিনে। লেখাপড়ায় ভালো হওয়ায় বাবা মায়ের স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু সে স্বপন আর পূরণ হলো না পরিবারের।
প্রতিবেশী কাওছার আলী বলেন, সবুজ আলী আমার এলাকার বড়ভাই। তিনি ২০১৮-২০১৯ শিক্ষা বর্ষে পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা কলেজে। সম্প্রতি অনার্স পর্ব শেষে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন বলে আমি জানি। কলেজের উত্তর ছাত্রাবাসের ২০৫ নম্বর কক্ষে থেকে লেখাপড়া করতেন।
এদিকে সবুজের হত্যার বিচার দাবি করে নীলফামারীতে সংসবাদ সম্মেলন করেছে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ। সবুজ আলী ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতা দাবি করা হয় ওই সংবাদ সম্মেলনে।
বুধবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে ওই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন নীলফামারী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর। সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয় বিএনপি-জামাত শিবিরের বর্বরোচিত হামলায় সবুজ আলী নিহত হয়েছেন।

এ সময় সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর বলেন, সবুজ আলী আমাদের সন্তান। একজন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার বাবা একজন ভ্যান চালক, যার ভাই ঢাকায় গার্মেন্টসের একজন শ্রমিক। সবুজ আলীকে ঘিরে ওই পরিবারের অনেক স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্নটা কিন্তু এক নিমেষে নিভে গেল। একটা ছাত্রলীগের কর্মীকে কারা হত্যা করতে পারে? নিশ্চই দেশ বিরোধী শক্তি। যারা একাত্তরে এই দেশের বিরোধীতা করেছে, যারা জ্বালাও পড়াও রাজনীতি করেছে, অবরোধের রাজনীতি করে, হত্যার রাজনীতি করে, বাংলাদেশে অরাজকতার সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল। যারা জঙ্গীবাদের জন্ম দিয়েছে। যে জঙ্গীবাদের শিকার সারা বাংলাদেশে নানান ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা দেশবাসীকে বলতে চাই, আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি। আমরা সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করি।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আবুজার রহমান। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মমতাজুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ওয়াদুদ রহমান, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মসফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন মুন, জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিদ মাহমুদ, সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জ্যেতির্ম রায় খোকন ও শান্তনা চক্রবর্তী প্রমূখ।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সবুজ আলী হত্যার বিচার দাবিতে বুধবার বিকেলে জেলা শহরে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়।
‘আন্দোলনকারীদের হামলাতেই ঢাকার দুইজন নিহত’