এবারের ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচটি যেন পুরোপুরি, আমেরিকান ফুটবলের ফাইনাল হিসাবে পরিচিত সুপার বোলের আদলে রূপ নিতে যাচ্ছে, যেখানে প্রথমার্ধের বিরতিতে পারফর্ম করবেন জাস্টিন বিবার, ম্যাডোনা, শাকিরা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটিএস। তবে, এই ১১ মিনিটের জমকালো পারফরম্যান্স নিয়ে ইতিমধ্যেই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার এই ফাইনাল ম্যাচের বিরতির সময় আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ১৫ মিনিটের চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘ হতে পারে।
ফিফা অবশ্য এর আগেও এমন নিয়ম ভেঙেছে। গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপ ফাইনালে জে বালভিন, দোজা ক্যাট এবং টেমসের পারফরম্যান্সের জন্য প্রথমার্ধের বিরতি বাড়িয়ে ২৫ মিনিট করা হয়েছিল। সম্প্রচার মাধ্যমের সূত্র ধরে ‘দ্য টাইমস’ জানিয়েছে, এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালের বিরতি প্রায় ৩০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অন্যদিকে ‘দ্য অ্যাথলেটিক’ প্রকাশ করেছে, ফিফা বিরতিটি ২০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার ফলে মাঠের ভেতর মঞ্চ তৈরি এবং তা সরানোর জন্য মাত্র ৯ মিনিট সময় পাওয়া যাবে।

ফিফা জানিয়েছে, এই কনসার্ট বা শো থেকে অর্জিত অর্থ তাদের গ্লোবাল সিটিজেন এডুকেশন ফান্ডে প্রদান করা হবে, যার লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে শিশুদের শিক্ষা ও ফুটবল খেলার সুযোগ তৈরি করতে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করা। ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো এই আয়োজন সম্পর্কে বলেছেন, এটি নিশ্চিতভাবেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মঞ্চ হতে যাচ্ছে এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় কয়েকশ’ কোটি মানুষ এটি উপভোগ করবেন। এই শো-তে পাপেট চরিত্র ‘সিল্কি স্ট্রিট’ এবং ‘দ্য মাপেটস’-এর চরিত্রগুলোকেও দেখা যাবে।
আমেরিকান দর্শকদের কাছে এই ধরনের মেগা হাফ-টাইম শো নতুন কিছু নয়; এনএফএল’র ‘সুপার বোল’ বিরতির শো বিশ্বজুড়ে অন্যতম জনপ্রিয় একটি মিউজিক্যাল এবং পপ কালচার ইভেন্ট। তবে ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে এই ধরনের আয়োজন ফুটবলের ঐতিহ্যগত নিয়মের বাইরে একটি বড় বিচ্যুতি, যা খেলোয়াড়, সাংবাদিক ও ফুটবল ভক্তদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সাবেক এ-লিগ খেলোয়াড় স্টিফান মক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ফিফার আরেকটি লজ্জাজনক সিদ্ধান্ত। মানুষ ফুটবল ভালোবাসে বলেই এই খেলা দেখে, এর চারপাশের অন্য সব আড়ম্বরের জন্য নয়। বিরতি এতটা দীর্ঘ হলে খেলোয়াড়দের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাবে, যা দ্বিতীয়ার্ধে ইনজুরির ঝুঁকি ও বাজে পারফরম্যান্সের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে।

দ্য টেলিগ্রাফের সাংবাদিক জেসন বার্ট লিখেছেন, মনে হচ্ছে ফিফা ফুটবলকে ‘আমেরিকান সকার’-এ রূপান্তর করার মিশনে নেমেছে। মাঠের মূল আকর্ষণ সবসময় জার্সি, শর্টস, মোজা আর বুট পরা ফুটবলাররাই হওয়া উচিত, যারা গোল করার জন্য বলে লাথি মারেন। ব্যস, এটুকুই আসল। তা না হলে ফুটবল এত জনপ্রিয় হতো না। বাকি সবকিছুই শুধু লোভের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ফুটবল নিজেই নিজেকে ধ্বংস করার ঝুঁকিতে পড়ছে।
ফুটবল সাংবাদিক সেব স্টাফোর্ড-ব্লুর লিখেছেন, শারীরিক কন্ডিশনিং এবং নিয়মের দিক থেকে ৩০ মিনিটের একটি হাফ-টাইম শো সম্পূর্ণ অর্থহীন। পরিষ্কার ভাষায় বলতে গেলে, এটি ফুটবলের চেয়ে অন্য বিষয়কে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার আরেকটি নিকৃষ্ট উদাহরণ।
