আফগানিস্তানে আবারো তালেবান শাসন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এরিমধ্যে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। আশরাফ ঘানি সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে তালেবান নেতা। যে কোন মুহূর্তে ঘানি সরকারের ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণা আসতে পারে।
এরই মধ্যে তালেবান নেতারা তাদের যোদ্ধাদের কোন রকম সশস্ত্র সংঘর্ষে না জড়াতে নির্দেশ দিয়েছে। সেই সঙ্গে যারা কাবুল ছাড়তে চায় তাদেরকে সহায়তা করতে বলেছে। এছাড়া, আফগান সেনা সদস্যদের তাদের নিজ নিজ বাড়ি ফিরে যেতে বলেছে তালেবান।
.jpg)
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, কাবুলে প্রবেশের পথে তালেবানকে কোন প্রকার বাধার মুখেই পড়তে হয়নি। শহরের বেশিরভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা। বাগরামের মার্কিন বিমান ঘাঁটি এবং মধ্য বামিয়ান প্রদেশেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তালেবান।
এরই মধ্যে কাবুলের আমেরিকান ও ব্রিটিশ দূতাবাস থেকে সব কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নেয়া শুরু করেছে দুই দেশের সামরিক বাহিনী। এছাড়া, অন্যান্য দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তা ও দাতা সংস্থার কার্যালয় থেকে কর্মকর্তারা নিজ নিজ দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সেই সঙ্গে নিরাপত্তা ও হামলার ভয় কাবুল থেকে দলে দলে লোকজন পালাতে শুরু করেছে। আশপাশ এলাকা ও প্রদেশে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তারা হন্য হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তবে, তালেবান জানিয়েছে, কোন আফগান নাগরিকের ওপর প্রতিশোধ নেয়া হবে না।
তালেবানের মুখপাত্র সুহাইল শাহিন বলেন, ‘আফগানিস্তানের সকল নাগরিককে আমরা নিশ্চয়তা দিতে চাই, বিশেষ করে কাবুলবাসীদের যে, তাদের জানমালের কোন ক্ষতি হবে না। কোন ধরনের প্রতিশোধ নেওয়া হবে। সবাই আমাদের কাছ থেকে নিরাপদ।’
.jpg)
তিনি জানান, তালেবান নেতারা যোদ্ধাদের শহরের প্রবেশমুখে থাকতে বলেছেন। শহরের ভেতরে না ঢুকতেও নির্দেশনা দিয়েছেন। সবাই অপেক্ষা করছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য। তালেবান জনগণের সেবক হতে এসেছে, শাসক হতে নয় বলেও জানান, শাহিন।
তিনি আরো জানান, নতুন ইসলামি সরকারে আফগানিস্তানের বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষকে রাখা হবে। যারা তালেবান নয়, তাদেরও সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
এর আগে আফগানিস্তানের বেশিরভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর রাজধানী কাবুলের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে তালেবান যোদ্ধারা। দ্রুতগতিতে তারা কাবুলের প্রধান প্রধান প্রবেশ পথ ও উপকণ্ঠের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান। কোন প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়নি তাদের।
কাবুল ঘিরে ফেলার পর, আফগান সরকারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আলোচনা শুরু করে তালেবান। ঘানি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও দেন-দরবার চলছে। এখন পর্যন্ত সব কিছু শান্তিপূর্ণ।
তালেবান কাবুলে ঢুকে পড়েছে এমন খবরের আগ থেকেই দলে দলে মানুষ রাজধানী থেকে পালাতে শুরু করেন। যার যা কিছু আছে, তাই নিয়েই তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। কেই ধরেছে বিমানবন্দরের পথ, কেউ ধরেছে সড়ক পথ।
দিনভর কাবুলের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ছিলো গ্রাহকের ভিড়। পালানোর আগে টাকা তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়ে ব্যাংকগুলোতে। বিভিন্ন বাজার ও বিপণীতে কেনাকাটায় তাড়াহুড়ো পড়ে যায়। অন্যান্য বেসরকারি অফিসও ফাঁকা হয়ে যায় দ্রুত।
রোববার সকালেই কাবুলের বাইরে পৌঁছে যায় তালেবান যোদ্ধারা। সেই খবর পেয়ে কাবুলের প্রায় সব সরকারি-বেসরকারি অফিস থেকে কর্মীদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। সবাইকে বাড়ি ফেরার নির্দেশ দেয় প্রশাসন। তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরতে গিয়ে কাবুলে তৈরি হয় তীব্র যানজট।
একই সঙ্গে আফগান সরকার মেয়েদের সুরক্ষিত জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। তার আগেই কাবুল ছেড়ে অনেকে বাইরে যেতে শুরু করেন। তবে সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে এখনো অনেকেই কাবুলে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন।
কাবুল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর, প্রেসিডেন্টের বাসভবনে যান তালেবান প্রধান মোল্লা আবদুল গনি ব্রাডর ও অন্যান্য নেতারা। তিনিই আফগানিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাবুলের প্রায় সব সরকারি ভবনের মাথায় উড়ছে তালেবানের পতাকা।
.jpg)
শহরের রাজপথে উল্লাসে করছে তালেবান যোদ্ধারা। জেল থেকে বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে কাউকে কোন ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনায় জড়িত না হতে নির্দেশ দিয়েছে তালেবান নেতারা। বলা হয়েছে, কোন ধরনের সংঘাত চান না তারা।
প্রায় ২০ বছর আগে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর হাতে ক্ষমতাচ্যুত হয় তালেবান। ক্রমাগত অভিযানে তালেবান কোণঠাসা হয়ে পড়লেও কখনও হাল ছেড়ে দেয়নি গোষ্ঠীটি। সন্ত্রাসী হামলার পাশাপাশি প্রকাশ্যে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে।
দীর্ঘ ২০ বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের লড়াই ও প্রাণহানির পর জো বাইডেনের সরকার আফগানিস্তান থেকে সব সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। সেই অনুযায়ী ২ জুলাই কাবুলের ৪০ কিলোমিটার দূরে বাগরাম বিমানঘাঁটি থেকে সবশেষ সেনাদলকে প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র।
একাত্তর/এআর
