বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে এসেছে শ্বেতপত্রে। সেই হিসেবে গত ১৫ বছরে পাচার হয়েছে ২৪০ বিলিয়ন বা দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।
গেলো বছরের পাঁচ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একের পর দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে শুরু করে। এরিমধ্যে সেই সব অভিযোগ আমলে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরাতে একযোগে কাজ করছে বিএফআইইউ, সিআইডি ও দুদক।

এই পরিস্থিতিতে প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হাসিনার পতনের পরে তার ঘনিষ্ঠেরা ব্রিটেনে নিজেদের সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা করছেন। হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময় তার পরিবার ঘনিষ্ঠরা ব্রিটেনে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি তৈরি করেছেন বলে নানা সময়ে অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটেনের তদন্ত সংস্থা ‘ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি’ (এনসিএ) বেশ কয়েক জনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে।
‘দ্য গার্ডিয়ান’ এবং আন্তর্জাতিক তথ্যানুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের যৌথ তদন্ত থেকে জানা গেছে, হাসিনা-ঘনিষ্ঠরা ব্রিটেনে নিজেদের সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা হস্তান্তর করছেন। গত বছরে এমন অন্তত ২০টি লেনদেনের আবেদন জমা পড়েছে ব্রিটেনের ভূমি নিবন্ধন কার্যালয়ে। এসব লেনদেন এমন সব ব্যক্তিদের নাম রয়েছে যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থার তদন্তের তালিকায় রয়েছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বলছে, মূলত সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক এবং হস্তান্তরের উদ্দেশ্যেই এই আবেদনগুলো করা হয়েছে। তবে আবেদনগুলো কোন সময়ে করা হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত কোন তথ্য তদন্ত প্রতিবেদরনে উল্লেখ করা হয়নি। তবে গত বছরের জুলাইয়ে আন্দোলন শুরুর পর থেকে কয়েক জন বাংলাদেশি ব্রিটেনে নিজেদের সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের চেষ্টা করেছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে ওই প্রতিবেদনে।
শনিবার প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ান ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার প্রায় এক বছর পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমানে তীব্র দলীয় কোন্দল ও অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে লড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে লন্ডনের নাইটসব্রি জের টাউনহাউস বা সারের কোনো অভিজাত সড়কে অবস্থিত প্রাসাদসম বাড়ি অনেক দূরের বিষয় বলে মনে হতে পারে। তারপরও যুক্তরাজ্যের এসব বিলাসবহুল সম্পদ এই নাটকীয়তার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

গত মে মাসে ব্রিটেনের ‘এফবিআই’ নামে পরিচিত ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ছেলে ও ভাতিজার লন্ডনের প্রায় এক হাজার ৪৬৯ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করে। এই রহমান পরিবারের যুক্তরাজ্যের সম্পদের পোর্টফোলিও গত বছর গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছিলো। এছাড়াও লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান শিখরের অঢেল সম্পত্তির খোঁজও মিলেছে।
সালমান পুত্রের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের তিন সপ্তাহ পর সাইফুজ্জামান চৌধুরী শিখরের ১৭০ মিলিয়নের বেশি সম্পদ জব্দ করে এনসিএ। হাসিনার শাসনামলে বিপুল সম্পদ অর্জন করেন তিনি। যুক্তরাজ্যে ৩০০টিরও বেশি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে বিলাসবহুল টাউনহাউসও রয়েছে তার।

সাইফুজ্জামান চৌধুরীর অবৈধ সম্পদের বিষয়ে তদন্তে আরও দুই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে দুদক। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত এক বছরে তারা একাধিক সম্পদের লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ওই দুই ব্যক্তির একজন হলেন সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামানের ভাই আনিসুজ্জামান। অপরজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ব্যবসায়ী বললেও গার্ডিয়ান তার পরিচয় প্রকাশ করেনি।
ব্রিটেনের জমি নিবন্ধন প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, সম্প্রতি আনিসুজ্জামান চৌধুরীর মালিকানাধীন চারটি সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে সেন্ট্রাল লন্ডনের রিজেন্টস পার্কের আশপাশের ১৬৩ কোটি টাকার সমমূল্যের জর্জিয়ান টাউনহাউস নামের একটি সম্পত্তি রয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে বিক্রি হয় সম্পত্তিটি। এটি বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত লেনদেনের জন্য আরও তিনটি আবেদন জমা পড়েছে।
বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার কারাবন্দি সালমান রহমানের ছেলে ও ভাতিজার মালিকানাধীন সম্পত্তির বিষয়ে যুক্তরাজ্যের জমি নিবন্ধন প্রতিষ্ঠানে আরও তিনটি ‘লেনদেনের আবেদন’ জমা পড়েছে। সালমানের ছেলে আহমেদ শায়ান এফ রহমান ও ভাতিজা আহমেদ শাহরিয়ার রহমানের বিষয়েও ঢাকায় তদন্ত করছে দুদক।
এই ঘটনার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, আমরা সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টার বিষয়টি জানি। তাই ব্রিটেন সরকারের কাছে অনুরোধ, যাতে এই ধরনের সম্পত্তিকে আরও বেশি করে বাজেয়াপ্ত করা হয়। বস্তুত, গত মে মাসেই দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছিল, সলমান রহমান পরিবারের ৯ কোটি পাউন্ডের সম্পত্তি ‘ফ্রিজ়’ করেছে ব্রিটেনের গুরুতর এবং সংগঠিত অপরাধ দমন সংস্থা।
এর আগে হাসিনার দুই ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিক এবং আজমিনা সিদ্দিকের লন্ডনের সম্পত্তি ঘিরেও বিতর্ক দানা বাঁধে। বাংলাদেশি বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে, হাসিনার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছেন হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপও। যদিও এই ধরনের অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করে আসছেন টিউলিপ।
ওবায়দুল কাদেরসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন ১৫ অক্টোবর
প্লট দুর্নীতি: হাসিনাসহ ২৩ জনের ছয় মামলা বিচারের জন্য বদলির নির্দেশ