চীন বিশাল এক সামরিক কুচকাওয়াজে নতুন অস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য সমরাস্ত্র উন্মোচন করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা হিসাবেই দেখেছেন অনেকে। এই অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০ জনেরও বেশি বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে আতিথ্য দেন। যার মধ্যে রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন এবং উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনও ছিলেন। দুটো দেশই নানাভাবে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে।
বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কোয়ারের কুচকাওয়াজটি ছিলো বিশ্ব মঞ্চে শি'র ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং চীনের সামরিক দক্ষতার প্রদর্শন। এই কুচকাওয়াজে প্রথমবারের মতো চীন সবার সামনে অনেছে বহুল আলোচিত ‘গুয়াম কিলার’ ক্ষেপণাস্ত্র, উইংম্যান ড্রোন এবং রোবোটিক নেকড়ে। বেইজিংয়ে প্রদর্শিত সমরাস্ত্রের থেকে চীনের সক্ষমতা সম্পর্কে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে, সেগুলো তুলে ধরা হলো।

চীন তার অস্ত্র কতটা ভালোভাবে স্থাপন করতে পারে?
বুধবারের প্রদর্শনী থেকে যা স্পষ্ট তা হল চীন দ্রুত বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম। দশ বছর আগে, তারা যে সামরিক প্রযুক্তি দেখিয়েছিলো, সেসব ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবিত আরও উন্নত সরঞ্জামের প্রাথমিক অনুলিপি। কিন্তু এই এক দশকে চীন কতটা এগিয়েছে, সেটি ধারণা করাও এখন সম্ভব নয়।
সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সমর বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক মাইকেল রাস্কা বলেন, বেইজিংয়ের কুচকাওয়াজে আরও উদ্ভাবনী এবং বৈচিত্র্যময় অস্ত্র, বিশেষ করে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রকাশ পেয়েছে, যা তাদের প্রতিরক্ষা-শিল্প কমপ্লেক্স কতটা উন্নত হয়েছে তার প্রতিফলন।
প্যাসিফিক ফোরামের একজন সহযোগী ফেলো আলেকজান্ডার নীল বলেন, চীনের উপর-নিচ কাঠামো এবং উল্লেখযোগ্য সম্পদের কারণে এটি অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় দ্রুত নতুন অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম। এটি বিপুল পরিমাণেও তৈরি করতে পারে, যা এটিকে যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধা দিবে এবং শত্রুকে ঘায়েল করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অত্যাধুনিক সমর সজ্জা ও যুদ্ধজাহাজসব বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার ক্ষমতা আছে চীনের, যা দেশটিকে যে কোন রাষ্ট্রের থেকে এগিয়ে রাখবে। তবে চীনের সামরিক বাহিনী এসব অস্ত্র ব্যবস্থাগুলোকে কতটা ভালোভাবে একীভূত করতে পারবে, সেটির উপর নির্ভর করছে অনেক কিছু।
ড. রাস্কা প্রশ্র করেছেন, চীন হয়তো চটকদার সব সমরাস্ত্র দেখাতে পারে। কিন্তু তারা কি সাংগঠনিকভাবে চটপটে যেভাবে তাদের ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করতে পারবে? তিনি মনে করেন এটি সহজ হবে না। কারণ চীনা সেনাবাহিনী বিশাল হলেও তারা কয়েক দশক ধরে কোনও উল্লেখযোগ্য যুদ্ধে জড়িত ছিলো না।

আমেরিকাকে মোকাবেলায় ক্ষেপণাস্ত্রের উপর জোর দিচ্ছে চীন
চীন প্রচুর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যার মধ্যে কিছু নতুন রূপও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডংফেং-৬১, যা একাধিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম; ডংফেং-৫সি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যা উত্তর চীন থেকে উৎক্ষেপণ করে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত করতে পারে এবং গুয়াম কিলার ডংফেং-২৬ডি ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ ক্ষেপণাস্ত্র, যা গুয়ামে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত করতে পারে।
উন্মোচন করা হয় নতুন লেজার অস্ত্র এবং ‘রোবট নেকড়ে’ ড্রোন। এগুলো চীনের পারমাণবিক ভাণ্ডারের সর্বশেষ সংযোজন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ফোরামের গবেষক আলেকজান্ডার নিলের মতে, চীন তার ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট বাহিনীকে কৌশলগত প্রতিরোধের মূল অংশ হিসেবে গড়ে তুলছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর আধিপত্যের পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করা।
বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীই সবচেয়ে বড় ও আধুনিক। তাদের হাতে রয়েছে বিমানবাহী রণতরী ও ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ। তবে চীন এই দিক থেকে এখনও অনেকটা পিছিয়ে। তাই তারা সে দুর্বলতা পেছনে ফেলতে উন্মোচন করলো ‘গুয়াম কিলার’ নামে পরিচিত আইসিবিএম ডিএফ-৬১। যা মার্কিন প্রধান নৌ-ঘাঁটি গুয়ামে সরাসরি আঘাত হানতে সক্ষম।
এই অস্ত্র উন্মোচনের পর পশ্চিমা প্রতিরক্ষা মহলে এখন আলোচনা হচ্ছে, বিমানবাহী রণতরী ও স্ট্রাইক গ্রুপগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যে কোনো চীনা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে মার্কিন জাহাজগুলো এখন অনেকটা ‘সিটিং ডাকস’ অর্থাৎ সহজ শিকার। বেইজিং একদিকে যেমন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ তৈরি করতে চাইছে, অন্যদিকে দ্বিতীয় দফা পাল্টা হামলার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে চাচ্ছে।
সামরিক ভাষায় দ্বিতীয় দফা হামলা বা সেকেন্ড স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি মানে হলো- প্রথম আঘাতের পরেও শত্রুর বিরুদ্ধে পাল্টা পারমাণবিক হামলা চালানোর ক্ষমতা। বুধবারই চীন প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল ওয়াইজে-১৭ ও হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ওয়াইজে-১৯ দেখিয়েছে।
উন্মোচন করেছে পানির নিচে থেকে আঘাত হানতে সক্ষম বড় আকারের স্বয়ংক্রিয় ড্রোন এজেএক্স০০২, যা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। এছাড়া গোয়েন্দা কাজে ও মাইন খুঁজতে সক্ষম রোবটিক ‘নেকড়ে ড্রোন’ উন্মোচন করা হয়।

এআই ও ড্রোনে অনেক দূর এগিয়ে চীন
কুচকাওয়াজে বিভিন্ন ধরণের ড্রোন ছিল, যার মধ্যে কিছু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা চালিত ছিল, কিন্তু যেটি সবার নজর কেড়েছিল তা হল এজেএক্স-০০২ জায়ান্ট সাবমেরিন ড্রোন। এটি মানবহীন আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল নামেও পরিচিত, যার দৈর্ঘ্য ৬৫ ফুট। এটি সম্ভবত নজরদারি ও অনুসন্ধান মিশন পরিচালনা করতে পারে।
চীন তাদের জিজে-১১ স্টিলথ অ্যাটাক ড্রোনও প্রদর্শন করেছে, যাকে অনুগত উইংম্যান বলা হয়, যা একটি মানববাহী যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি উড়তে পারে এবং আক্রমণে সহায়তা করতে পারে। প্রচলিত আকাশ ড্রোনের একটি সিরিজের পাশাপাশি, রোবোটিক নেকড়েও ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলোতে অনুসন্ধান এবং মাইন অনুসন্ধান থেকে শুরু করে শত্রু সৈন্যদের শিকার পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। ড্রোন প্রদর্শনীটি চীন তার সামরিক কৌশলের সাথে কী নিতে চায় তা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, যেখানে শুধু শক্তি বৃদ্ধিই নয়, কাঠামো প্রতিস্থাপন করতেও চায়।
ড. রাস্কা উল্লেখ করেন, চীন ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে এটি স্পষ্টভাবে শিক্ষা নিয়েছে, যেখানে কেউ শত্রুর দিকে ড্রোন নিক্ষেপ করতে পারে, যাতে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। অধ্যাপক নীল যোগ করেছেন, দ্রুতগতির যুদ্ধে শত্রুকে পরাজিত করতে ‘ন্যানোসেকেন্ড সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা এআই করতে পারে।

চীনের কাছে প্রযুক্তি থাকলেও আমেরিকা এখনও এগিয়ে
এই কুচকাওয়াজ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে, চীন তার সামরিক প্রযুক্তিতে দ্রুত আমেরিকার সাথে তাল মিলিয়ে চলেছে এবং বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার তৈরির জন্য তাদের সম্পদ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিন্তু সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে আমেরিকা এখনও এগিয়ে রয়েছে।
মার্কিন সেনাবাহিনী বহু বছর ধরে যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সফলতার পর থেকে দেশটি কোন ধরনের বিরতি ছাড়াই গোটা বিশ্বে বিভিন্ন যুদ্ধে নিজেদেরকে জড়িয়েছে। আমেরিকার মধ্যে এক ধরনের যুদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে এবং অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। ড. রাস্কা বলেন, আকাশ-নৌ-স্থলভাগে সমানভাবে সক্ষমতা অর্জন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে কৌশলের দিক থেকে চীনের থেকে এগিয়ে আমেরিকা।
অন্যদিকে, চীন খুবরই শৃঙ্খলিত একটি সামরিক শক্তি দেশ। উপর থেকে নিচে ভীষণ কড়াকড়া ও কঠিন এক নিয়মের অনুসারী দেশটির সেনাবাহিনী। চটকদার প্ল্যাটফর্ম এবং সিস্টেম থাকতে পারে, কিন্তু তারা উপরে থেকে আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত এক চুলও নড়াচড়া করবে না।
চীন মনে করে তাদের প্রযুক্তি প্রতিরোধ তৈরি করে। তারা বিশ্বাস করে, এটি যুক্তরাষ্ট্রকে বাধা দেবে, অভিযান স্তরে স্তরে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যাতে মনে হয়েছে যতটা ভালো বলে তারা, ততটা ভালো নাও হতে পারে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের দিকে ইঙ্গিত করে ড. রাস্কা বলেন, যেমন গত মাসে ফিলিপাইনের উপকূলরক্ষীর মুখোমুখি হওয়ার সময় একটি চীনা যুদ্ধজাহাজ তাদের নিজস্ব একটি ছোট জাহাজকে ধাক্কা দেয়।

বেইজিং কুচকাওয়াজটি ছিল অস্ত্র বিক্রির একটি মঞ্চ
দুই ডজনেরও বেশি দেশের নেতাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর সাথে সাথে অস্ত্র ও ট্যাঙ্কের কুচকাওয়াজ মূলত সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে চীনা অস্ত্র বিক্রির একটি বিশাল মঞ্চ ছিলো বলে মনে করের নীল। তিনি বলেন, উপস্থিত কিছু দেশ- যেমন মিয়ানমার, ইতিমধ্যেই বিপুল পরিমাণে চীনা অস্ত্র কিনছে বলে জানা গেছে। নতুন গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করার বা অর্ডার বাড়ানোর সুযোগ কের নিলো চীনা সরকার।
প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে ছিলেন শি-এর সাথে সামনে এবং কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি ভ্লাদিমির পুতিন এবং কিম জং উন। তিনজন একসাথে কুচকাওয়াজে হেঁটে যাওয়ার সময় এবং মঞ্চে দাঁড়ানোর সময় একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট উপস্থাপন করেছিলেন।
নীল বলেন, আমেরিকা যদি সত্যিই চীনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায়, তাহলে একই সময় একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রকে সামাল দিতে হবে তাদেরকে। কোরীয় উপদ্বীপ, তাইওয়ান প্রণালী এবং ইউক্রেন- এই তিনটি ফ্রন্টে একযোগে নিজেদের কৃতিত্ব যাচাই করা আমেরিকার জন্য যেমন ব্যয় সাপেক্ষ হবে, তেমনি চ্যালেঞ্জিংও বটে। সবচেয়ে বড় কথা তিনটি ক্ষেত্রেই যদি আমেরিকার ওপর চাপ তৈরি করা হয়, তাহলে একটিতে ওয়াশিংটন ব্যর্থ হবে।
