ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার রাতভর ড্রোন হামলায় অন্তত দুইজন নিহত এবং আরও ডজনখানেক মানুষ আহত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মতে, হিমাঙ্ক নিচে নামা তীব্র শীতের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে।
রোববার সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে জেলেনস্কি জানান, সুমি, খারকিভ, দনিপ্রো, জাপোরিঝিয়া, খমেলনিটস্কি এবং ওডেসা অঞ্চল লক্ষ্য করে দুইশ’র বেশি ড্রোন দিয়ে এই হামলা চালানো হয়েছে।
এক্স পোস্টে জেলেনস্কি লেখেন, জ্বালানি ব্যবস্থার পরিস্থিতি এখনও বেশ সংকটাপন্ন, তবে আমরা সব সেবা দ্রুততম সময়ে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, এই সপ্তাহেই মোট ১,৩০০-র বেশি ড্রোন, হাজার গাইডেড এরিয়াল বোমা এবং ২৯টি বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।
জেলেনস্কি বিশ্বনেতাদের প্রতি আবারও সাহায্যের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইউক্রেনের এখন আরও সুরক্ষা প্রয়োজন- বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য আরও ক্ষেপণাস্ত্র দরকার। রাশিয়া যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে, তবে বিশ্বকে অবশ্যই চূড়ান্ত জবাব দিতে হবে। ইউক্রেনের জন্য আরও সহায়তা এবং আক্রমণকারীর ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটলো যখন ইউক্রেনের মধ্যস্থতাকারীরা প্রায় চার বছর ধরে চলা রাশিয়ার সাথে এই যুদ্ধ অবসানের উপায় নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে দেখা করতে পৌঁছেছেন। এই আলোচনায় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনের পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ২০ দফা শান্তি প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করলেও রাশিয়া এখনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ওয়াশিংটনের যুদ্ধ বিরতির প্রচেষ্টাগুলো এখন পর্যন্ত কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। গত কয়েক মাস ধরে রুশ সরকার বেশ কিছু দাবি জানিয়ে আসছে, যার মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড ছেড়ে দেয়া এবং ইউক্রেন কখনোই ন্যাটোর সদস্যপদ গ্রহণ করবে না- এমন নিশ্চয়তা দেয়া।
টানা রুশ বোমাবর্ষণের কারণে ইউক্রেন বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। জেলেনস্কি শনিবার বলেন, বিদ্যুৎ আমদানি এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরঞ্জাম সরবরাহের গতি বাড়াতে হবে, কারণ রাজধানী কিয়েভসহ খারকিভ এবং জাপোরিঝিয়া অঞ্চল বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইউক্রেনীয় সরকার ইতিমধ্যে জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে, কারণ ক্ষতিগ্রস্ত গ্রিডগুলো দেশের মোট চাহিদার মাত্র ৬০ শতাংশ মেটাতে সক্ষম হচ্ছে।
অস্বাভাবিক শীতের প্রকোপ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যার ফলে ইউক্রেনজুড়ে অনেক পরিবার নিজেদের উষ্ণ রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে রাশিয়া প্রায়শই শীতকালে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে, যাতে মস্কোর শর্ত মেনে নিতে ইউক্রেনীয় নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা চলতি বছর ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে রুশ হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং উল্লেখ করেছে, এর ফলে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এদিকে, শনিবার ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার পর রাশিয়ার দখলকৃত জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে ২ লক্ষাধিক গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন মস্কো-নিযুক্ত গভর্নর ইয়েভজেনি বালিটস্কি।
টেলিগ্রামে এক বিবৃতিতে বালিটস্কি বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে, তবে প্রায় ৪০০টি বসতি এখনও অন্ধকারে রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এই এলাকার প্রায় ৭৫ শতাংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যেখানে তাপমাত্রা বর্তমানে হিমাঙ্কের অনেক নিচে অবস্থান করছে।
