যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান সবশেষ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’ এর মেয়াদ গত বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। কয়েক দশক পর এই প্রথম বিশ্বের দুই প্রধান পারমাণবিক পরাশক্তি তাদের অস্ত্রাগারের ওপর কোনো প্রকার আইনি বিধিনিষেধ ছাড়াই অবস্থান করছে, যা একটি নতুন ও ভয়াবহ পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে।
চুক্তির প্রেক্ষাপট ও বর্তমান সংকট: ২০১১ সালে কার্যকর হওয়া এই ঐতিহাসিক চুক্তির আওতায় দুই দেশ তাদের মোতায়েন করা পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা ১,৫৫০ এবং আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ভারী বোমারু বিমানের সংখ্যা ৭০০-তে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য ছিল। ২০২১ সালে চুক্তির মেয়াদ পাঁচ বছরের জন্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল, যার সময়সীমা ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হলো।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক থমাস কান্ট্রিম্যান এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, কোনো ছোটখাটো বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দ্রুত বড় ধরনের পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।”
ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ও চীনের ভূমিকা: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, এই চুক্তিটি এখন সেকেলে হয়ে পড়েছে কারণ এতে চীন অন্তর্ভুক্ত ছিল না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ২১ শতকে সত্যিকারের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ তখনই সম্ভব যখন এতে চীনের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পেন্টাগনের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের ওয়ারহেডের সংখ্যা ১,৫০০-তে উন্নীত করতে পারে।
তবে বেইজিং এখন পর্যন্ত এমন কোনো ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতিকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি, তাই রাশিয়া এখন আর কোনো বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ নয় এবং তারা তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে স্বাধীন।

অস্ত্র প্রতিযোগিতার নতুন শঙ্কা: বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এতে করে রাশিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে স্বচ্ছতা ও তথ্য পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, নিউ স্টার্ট চুক্তির প্রধান মার্কিন মধ্যস্থতাকারী রোজ গোটমোলার সতর্ক করেছেন, রাশিয়া খুব দ্রুত তাদের মিসাইলগুলোতে অতিরিক্ত ওয়ারহেড যুক্ত করার সক্ষমতা রাখে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে দিতে পারে। কারণ রাশিয়ার সক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সেই শিল্প সক্ষমতা বর্তমানে ততটা প্রস্তুত নয়।
নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ১,৫৫০টি মোতায়েন করা কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেডের সীমাবদ্ধতা এখন আর নেই। এর অর্থ হলো, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয় দেশই আইনিভাবে তাদের ইচ্ছামতো যত খুশি অস্ত্র উৎপাদন ও মোতায়েন করতে পারবে।
রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি এখন চীনও এই বিপজ্জনক অস্ত্র প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠেছে। বেইজিং তাদের ঐতিহাসিক ‘ন্যূনতম প্রতিবন্ধকতা’ নীতি থেকে সরে আসছে এবং ধারণা করা হচ্ছে , ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের ওয়ারহেডের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা এছাড়া হাইপারসনিক মিসাইল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত কমান্ড সিস্টেম এবং উন্নত মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একটি তীব্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা করছেন।
মিত্রদের ওপর প্রভাব: কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তির মুখে যুক্তরাষ্ট্র যদি কঠোর অবস্থান না দেখায়, তবে মিত্র দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে সন্দিহান হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে ওই দেশগুলোও নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের সাথে একটি বড় চুক্তির আশায় এই পুরোনো চুক্তিটি শেষ হতে দিয়েছেন। তবে চীনকে আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব না হলে পৃথিবী একটি অনিয়ন্ত্রিত ও বিপজ্জনক ত্রিভুজাকার পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে শুক্রবার মাস্কাটে বসছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রস্তাবিত রূপরেখা চূড়ান্ত!