ইরানের সঙ্গে কতদিন লড়তে পারবে ইসরাইল?

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলেছে, এটি কোনো বড় সমস্যা নয় এবং দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের সামরিক বাহিনীর রয়েছে।

কিন্তু ইসরায়েলের জন্য চিত্রটা ভিন্ন। গাজায় গণহত্যা চালানো এবং লেবানন ও সিরিয়ায় দফায় দফায় হামলা বা যুদ্ধের কারণে ইসরাইল ইতিমধ্যেই ক্লান্ত। তার ওপর ইরানের সাথে পূর্ববর্তী সংঘাতের ধকল তো আছেই; ফলে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া ইসরাইলের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হতে পারে।


গত শনিবার ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইসরাইলকে মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর ফলে পুরো দেশজুড়ে বিমান হামলার সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে, স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং হাজার হাজার রিজার্ভ সৈন্যকে তলব করা হয়েছে।

হাইফা ও তেল আবিবের মতো শহরগুলো টানা হামলার শিকার হচ্ছে, জরুরি সেবা সংস্থাগুলো হিমশিম খাচ্ছে। দেশটির মানুষ, যারা নিজেদের সরকারের অন্য দেশের ওপর চালানো যুদ্ধের ভয়াবহতায় অভ্যস্ত ছিল না, তারা গত কয়েকদিন ধরে শুধু বোমা শেল্টারের ভেতরে আসা-যাওয়ার মধ্যেই সময় কাটাচ্ছে।


তবে আপাতত যুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থন বেশ তুঙ্গে। প্রধান শহরগুলোতে ইসরায়েলিদের সাক্ষাতকার নিলে দেখা যায়, তারা কয়েক দশক ধরে যাদের ‘অস্তিত্বের শত্রু’ হিসেবে জেনে এসেছে, সেই ইরানের মুখোমুখি হতে মরিয়া। কট্টর বামপন্থী কিছু দল বাদে প্রায় সব রাজনীতিবিদই সরকারের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

ইসরাইলি রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়া মাত্রই ইসরাইলে সামরিক উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের সাথে এর পার্থক্য আছে। তখন ছিল আতঙ্ক আর অস্তিত্ব হারানোর ভয়। আর এখনকার পরিস্থিতি হলো উগ্র সামরিকবাদ আর অতি-আত্মবিশ্বাস। এমনকি যুদ্ধের গুটিকয়েক সমালোচকও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ ‘সংক্ষিপ্ত’ করার পরামর্শ দিচ্ছেন, যেন ইসরাইল চাইলেই ঠিক করতে পারবে এই যুদ্ধ কখন শেষ হবে!

অনেকের মতে, এই যুদ্ধ-উন্মাদনা ইসরাই্লি সমাজের উগ্রবাদী রূপান্তরের একটি অংশ। আগে যারা রাজনীতির মূল স্রোতে ছিলেন না, এমন উগ্র ডানপন্থীরা এখন সরকারের কেন্দ্রে। রাজনৈতিক বিভাজন এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে তরুণ ও মেধাবীরা দেশ ছাড়ছেন। আর যারা রয়ে গেছেন, তারা জন্ম থেকেই ইরানকে পরম শত্রু হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত।

কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী, সব স্তরেই তাদের মনে গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে ইরান এক ‘চরম অশুভ শক্তি’। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, এটি অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের ‘ব্লিৎজ’ পরিস্থিতির মতো। ব্রিটিশরা তখন বোমাবর্ষণ সহ্য করেছিল কারণ তারা মনে করত তারা এক অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে। ইসরাইলিদের অনুভূতিও ঠিক তেমন। নেতানিয়াহু এখন আমাদের বলছেন ‘তলোয়ারের ওপর ভর করেই বাঁচতে হবে। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়, টিকে থাকার জন্য ইসরাইলের সব সময় একজন শত্রুর প্রয়োজন।


গোলা ও অস্ত্রের হিসাব:
সামাজিক প্রভাবের বাইরেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইসরাইলকে সামরিক সক্ষমতার হিসাব কষতে হবে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজে আত্তারের মতে, সব থেকে বড় প্রশ্ন হলো ইরান বা সমশক্তির দেশের বিরুদ্ধে ইসরাইল কতদিন এই পর্যায়ের লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে। এটি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর সাহায্যের ওপর এবং ইসরাইলের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ইরানের আগে ফুরিয়ে যায় কি না তার ওপর।

আত্তার আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের প্রথম তিন দিনে ইরান ২৫০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছে। অথচ ১২ দিনের যুদ্ধের সময় এই সংখ্যা ছিল ৫০০। প্রতিটি মিসাইল ঠেকাতে ইসরাইলকে একটি করে ইন্টারসেপ্টর রকেট ছুড়তে হয়। এটি ইসরাইলের সাধারণ সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া ইসরাইল এতক্ষণে নিজেদের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত।

ইসরাইলের হাতে তিন স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে: স্বল্প পাল্লার জন্য ‘আয়রন ডোম’, মাঝারি পাল্লার জন্য ‘ডেভিডস স্লিং’ এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকানোর জন্য ‘অ্যারো ২ ও ৩’।


ইসরাইল তাদের মজুত ইন্টারসেপ্টর রকেটের সংখ্যা গোপন রাখলেও ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ই তাদের মজুত ফুরিয়ে আসতে শুরু করেছিল। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাদের এই রকেটের রেশনিং বা হিসাব করে ব্যবহার করতে হবে। তখন তারা শুধু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক স্থাপনাগুলো রক্ষা করবে, যার ফলে বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।

অর্থনৈতিক বিবেচনা: বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, টানা দু’বছরের যুদ্ধ ইসরাইলের অর্থনীতিতে বড় ক্ষত তৈরি করেছে। অস্ত্রের আকাশচুম্বী খরচ ও লাখো রিজার্ভ সেনাকে দীর্ঘকাল মোতায়েন রাখা পরিকল্পনাকারীদের হিসাব উল্টে দিয়েছে। ২০২৪ সালে লেবানন ও গাজা যুদ্ধে ইসরাইলের খরচ ছিল প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার, যা বাজেটে বড় ঘাটতি তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক তথ্য বলছে খরচ ৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।


অর্থনৈতিক চাপের কারণে বিশ্বের শীর্ষ তিনটি রেটিং এজেন্সিই ইসরাইলের ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। শির হেভারের মতে, ইসরায়েল এখন ঋণ সংকট, জ্বালানি সংকট, পরিবহন সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি এ-ও সতর্ক করেছেন, এই অর্থনৈতিক সংকট একা যুদ্ধ থামাতে পারবে না।

তিনি বলেন, এটি এখন অর্থনীতির চেয়ে প্রযুক্তির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরাইলকে এমন উন্নত অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে যা নিজে নিজেই লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে মারতে পারে এবং সেনা ঝুঁকি ছাড়াই দূর থেকে হামলা চালানো যায়, তবে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ইসরাইলের এই আগ্রাসন থামাতে পারবে বলে আমি মনে করি না।

এআরএস
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রের বারুদ আর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনের মাঝেই এবার এক অবিশ্বাস্য ও চটকদার রাজনৈতিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন বাহিনীর বিমান হামলায়...
গত এপ্রিল মাসে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে আমেরিকা এবং ইরান এক অলিখিত ও নজিরবিহীন মহাসংঘাতের...
তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা আমেরিকা-ইসরাইল বনাম ইরান যুদ্ধ বর্তমানে এক চরম অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি যখন ধুঁকছে, ঠিক তখনই...
হরমুজ় প্রণালী নিয়ে বিশ্ববাজারে সৃষ্ট উত্তেজনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের আরও এক লাইফলাইন বা গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অচল করে দেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি দিল ইরান। তেহরানের সোজা...
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বেলা পৌনে ১২টায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে এই যুক্তিতর্ক...
হজযাত্রীদের লাগেজ কাটার ঘটনাটি বাংলাদেশ অংশে ঘটেনি বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ নিয়ে যে প্রচার...
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশ অফিসের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার।
ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পর বেশ কিছুদিন পেরিয়ে গেলেও রাজধানীতে কর্মমুখী মানুষের ফেরার ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। নাড়ির টানে বাড়ি যাওয়া মানুষ চিরচেনা ব্যস্ত নগরজীবনে ফিরতে শুরু করায় ঢাকাও ধীরে ধীরে তার...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর