হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে ইরান এখন এক ভয়ংকর ‘ছায়া যুদ্ধ’ বা হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার শুরু করেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এখন সাধারণ কাঠের তৈরি মাছ ধরার নৌকার ছদ্মবেশে বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন বোট বা ‘সুইসাইড স্কিফ’ মোতায়েন করছে। যা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই জলপথে এক নতুন আতঙ্ক তৈরি করেছে।
ড্রোন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ড্রাগনফ্লাই’-এর সিইও ক্যামেরন চেল ফক্স নিউজ ডিজিটালকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস নিশ্চিত করেছে, গত ১ মার্চ ওমানের মাস্কাটের উত্তরে মার্শাল আইল্যান্ডসের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ইরানের একটি চালকবিহীন জলযান দ্বারা আক্রান্ত হয়। হামলার পর জাহাজের কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এছাড়া গত ১১ মার্চ পারস্য উপসাগরে আরও দুটি তেলের ট্যাঙ্কারে রিমোট-কন্ট্রোলড বিস্ফোরক নৌকার আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে।
ক্যামেরন চেল জানান, এই নৌকাগুলো সাধারণ ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কাঠের নৌকার মতো হওয়ায় রাডারে ধরা পড়া বা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। ইরান এই নৌকাগুলো নিয়ন্ত্রণে এনক্রিপ্টেড রেডিও কমিউনিকেশন বা ফ্রিকোয়েন্সি হপিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

মাত্র একজন অপারেটর তীরের নিরাপদ আস্তানায় বসে ১০টি নৌকার একটি পুরো ‘ঝাঁক’ বা সোয়ার্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিছু নৌকা আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা থাকায় সেগুলো প্রায় স্বাধীনভাবে লক্ষ্যবস্তুতে গিয়ে আঘাত হানতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন নৌবাহিনী বড় বড় যুদ্ধজাহাজ বা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারদর্শী হলেও, এক সাথে ৫০টি ছোট ছোট বিস্ফোরক ভর্তি নৌকার আক্রমণ সামলানো তাদের বর্তমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বেশ কঠিন।

চেল সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক অবস্থান ইরানের এই ধরণের সস্তা অথচ বিধ্বংসী আক্রমণের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। একটি সাধারণ মাছ ধরার নৌকার ভেতর বিস্ফোরক ভরে দিলে তা খুঁজে বের করা খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতো। এর মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে এখন আকাশপথে ব্যাপক নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানোর মতো বিশাল বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে এই প্রণালী বন্ধ রাখার শপথ নিয়েছেন। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। ইতিমধ্যে খবর পাওয়া গেছে যে, ইরান এই জলপথে অন্তত এক ডজন মাইন বিছিয়ে রেখেছে, যা জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এবং ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সচিব জন হিলি জানিয়েছেন, তাঁরা একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠন করে তেলের জাহাজগুলোকে পাহারা দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তবে সাগরের বুকে এই ‘ছদ্মবেশী খুনি’ নৌকাগুলোর হাত থেকে জাহাজগুলোকে রক্ষা করা এখন পেন্টাগনের জন্য সবথেকে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
