লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের বড়ো লোহার গেট। ওপাশে বন্দি জীবন, এপাশে স্বাধীনতা। কিন্তু সেই স্বাধীনতার স্বাদ নেই স্কুলড্রেস পড়া দুই শিশুর চোখে। একজন পঞ্চম শ্রেণির, অন্যজন দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাদের নিষ্পাপ চোখেমুখে না-বোঝা এক আতঙ্ক আর বিষণ্ণতা। কেন তাদের মা হঠাৎ এই লোহার গেটের ওপারে হারিয়ে গেলেন, সেই উত্তর খুঁজে ফিরছে তারা। ভেতরে আড়াই বছরের দুধের শিশুকে নিয়ে মা ফারহানা আক্তার শিল্পী, আর বাইরে তার ফেরার অপেক্ষায় দুই অবুঝ সন্তান।
লক্ষ্মীপুর পৌরসভার সাহাপুর এলাকার বাসিন্দা ফারহানা আক্তার শিল্পী। স্বামী ইসমাইল হোসেন ও তিন সন্তানকে নিয়ে সাধারণ এক সংসার ছিলো তার। কিন্তু গত ১৫ এপ্রিল প্রতিবেশী মাহাতাব উদ্দিন ভূঁইয়ার দায়ের করা একটি মারামারি মামলা ওলটপালট করে দেয় সবকিছু। মামলায় শিল্পীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি রড দিয়ে বাদির মাথায় আঘাত করেছেন। সোমবার বিকেলে আদালতের নির্দেশে শিল্পীকে কারাগারে পাঠানো হলে শুরু হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
শিল্পীর ছোট সন্তান সিয়াম, বয়স মাত্র আড়াই বছর। এখনও মায়ের কোল ছাড়া সে কিছু চেনে না। আইনি বাধ্যবাধকতায় শিল্পীকে যখন কারাগারে নেওয়া হয়, তখন কোলের শিশুটিকেও তার সঙ্গে যেতে হয়। জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ছোট্ট সিয়াম হয়তো বুঝতেই পারেনি, কেন তার শৈশবটা হঠাৎ লোহার গরাদে আটকে গেলো।
অন্যদিকে, শিল্পীর বড়ো দুই সন্তানের পরীক্ষা চলছে। স্কুলড্রেস পরেই তারা ছুটে এসেছিল জেলা কারাগারের সামনে। তাদের মা আর ছোট ভাইকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তারা। অপরাধ, আইন না বোঝা শিশু দুটির অপেক্ষা- কখন তারা মাকে নিয়ে বাড়ি যাবে!
আসামিপক্ষের আইনজীবী রাকিবুল হাসান তামিম জানান, মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছিলো, শিল্পীর আঘাতে বাদির ‘মগজ বের হয়ে গেছে’। তবে আদালতে জমা দেওয়া মেডিক্যাল সার্টিফিকেটে চিকিৎসকরা সেটিকে ‘সাধারণ জখম’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আইনজীবীর দাবি, ঘটনাটি জামিনযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও আদালত শিল্পীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আরেক আইনজীবী মহসিন কবির স্বপন বলেন, মায়ের সাথে আড়াই বছরের দুগ্ধপোষ্য শিশুটিও এখন কারাগারে। ওদিকে বাইরে থাকা অন্য দুই সন্তানের পরীক্ষা চলছে। পুরো বিষয়টি এখন চরম মানবিক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেল জানান, সোমবার বিকেলে আড়াই বছরের শিশু সিয়ামকে সঙ্গে নিয়েই তার মা শিল্পীকে কারাগারে আনা হয়েছে।
আইনি লড়াই তার নিজস্ব গতিতে চলবে, বিচার হবে অপরাধের। কিন্তু সাহাপুর এলাকার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন শুধুই সেই দুই শিশুর ছবি, যারা স্কুলড্রেস পরে জেলগেটে দাঁড়িয়ে মা’র জন্য অপেক্ষা করছিল। একটি মামলার আইনি মারপ্যাঁচে পড়ে সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে তিনটি শিশু—একজন জেলের ভেতরে মায়ের আঁচল আঁকড়ে, আর বাকি দুইজন বাইরে মায়ের অপেক্ষায়।
