যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানে একটি প্রাথমিক রূপরেখা চুক্তিতে পৌঁছেছে দুই দেশ। এর আওতায় দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধ, ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে এই সমঝোতা স্মারকটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার কথা রয়েছে। খবর রয়টার্সের।
স্থানীয় সময় রোববার বিকেলে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঐতিহাসিক অর্জনের ঘোষণা দেন। ট্রাম্প লেখেন, ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন হয়েছে। সবাইকে অভিনন্দন।’
তার এই পোস্টটির কিছুক্ষণ আগেই মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সোমবার স্থানীয় সময় ভোরে এই সফল সমঝোতার কথা প্রথম প্রকাশ করেন। কাতার ও পাকিস্তানের নিবিড় মধ্যস্থতায় তেহরানে দীর্ঘ ১৭ ঘণ্টার কূটনৈতিক আলোচনার পর এই ব্রেকথ্রু অর্জিত হলো।
চুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ শর্তাবলী এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ জানিয়েছেন, এই চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযানের অবিলম্বে ও স্থায়ী সমাপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবালয়ও এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, সোমবার রাত থেকেই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি জানিয়েছেন, এই প্রাথমিক সমঝোতার পর একটি ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তৃত চুক্তি নিয়ে পরবর্তী আলোচনা চলবে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান কর্তৃক গত কয়েক মাস ধরে অবরুদ্ধ থাকা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী আগামী শুক্রবার থেকে মাইন অপসারণের উদ্দেশে খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্প তার পোস্টে বিশ্ববাসীকে উদ্দেশ করে লেখেন, বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেলের প্রবাহ শুরু হোক!
এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড়ো ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। সোমবার প্রারম্ভিক লেনদেনে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ৪ শতাংশ এবং মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ৪.৬ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে এশিয়ার শেয়ার বাজারগুলোতে ব্যাপক তেজিভাব দেখা গেছে।
চুক্তির অন্যতম জটিল বিষয়—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এই দফায় চূড়ান্ত না করে আগামী ৬০ দিনের আলোচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের সূত্র মতে, ইরান আপাতত তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান স্থিতি বজায় রাখতে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ আর না বাড়াতে সম্মত হয়েছে।
তবে এই চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বাইডেন প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর আগের স্থিতাবস্থায় ফেরার জন্য ট্রাম্প ইরানকে অনেক বড় ছাড় দিয়েছেন। পারমাণবিক কর্মসূচি আদৌ বন্ধ হবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এই চুক্তিকে স্বাগত জানালেও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আসন্ন আলোচনা আমরা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবো। মার্কিন আইন অনুযায়ী, যেকোনো চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তি কংগ্রেসে ভোটাভুটির জন্য পাঠাতে হবে।
এই আলোচনা ও চুক্তির প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বাইরে ছিলো ইসরাইল। রোববার লেবাননের বৈরুতে ইসরাইলি বিমান হামলার ঘটনা ঘটলে ট্রাম্প এর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এই হামলাটি হওয়া উচিত হয়নি, বিশেষ করে এমন একটি দিনে যখন আমরা চুক্তির এতো কাছাকাছি।
ইসরাইলি গণমাধ্যম এনটুয়োলভ জানিয়েছে, ট্রাম্প ফোনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে এই চুক্তির অগ্রগতির কথা জানান। তবে লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধের মার্কিন চাপ নিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘একজন অত্যন্ত কঠিন লোক’ বলে অভিহিত করেন এবং মন্তব্য করেন যে, পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরানের হাত থেকে ইসরাইলকে বাঁচানোর জন্য নেতানিয়াহুর তাকে ধন্যবাদ জানানো উচিত।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইল বাহিনী ইরানে প্রথম বিমান হামলা চালানোর পর এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। ১০৭ দিন ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ইতিমধ্যে দুই পক্ষের হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
