একসময়ের খরস্রোতা খাল নয়াভাংগুনি। দারছিড়া নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খালটির দৈর্ঘ্য ছিল পৌনে তিন কিলোমিটার। সেই খালে একের পর এক বাঁধ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সরকারি এ খালের কোন অস্তিত্ব নেই, বানানো হয়েছে ৪০টি পুকুর। খালে বাঁধ দিয়ে এভাবে পুকুর বানিয়ে মাছ চাষ করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু লোকজনের বিরুদ্ধে। এতে করে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে খালের দুই পাড়ের বাসিন্দারা।
অবশেষে দীর্ঘ ১৫ বছর পর গতকাল সোমবার (২০ সেপ্টেম্বর) পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার নয়াভাংগুনি নামক ওই খালটি দখলমুক্ত করার অভিযান শুরু হয়েছে।
স্থানীয় প্রভাবশালী তাদের বসতবাড়ির সামনে বাঁধ দিয়ে পুকুর করে মাছ চাষ শুরু করলে ধীরে ধীরে স্থানীয়রাও খাল দখলে উৎসাহিত হয়। যাদের বাড়ির সামনে খালের অংশ গেছে তারাই বাঁধ দিয়ে পুকুর বানিয়েছে। ফলে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। খালের অবস্থা এতটাই সঙ্গিন যে দেখলে মনে হয় একেকটি পুকুর।
জানা গেছে, মাছ চাষের কারণে শুকনো মৌসুমে এই খালের পানি সেচ কাজে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। এখন বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হলেই পানিতে খালের দুই পাড়ের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি গাছপালা জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এছাড়াও ফসলি খেতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি চাষাবাদে বিঘ্নিত হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, খালটির দৈর্ঘ্য পৌনে তিন কিলোমিটার এবং প্রস্থ্য কোথাও ৪০ ফুট, কোথাও ৬০ ফুট। একসময় এই খাল দিয়ে বড় বড় নৌকা চলাচল করতো। ব্যবসায়ীরা মালামাল নৌকায় নিয়ে আসতো। এলাকার চাষীরা তাদের ধান-চাল বিক্রির জন্য নৌকায় করে হাট-বাজারে নিয়ে যেত। সেই খালের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ বাঁধ দেওয়ায় পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
খালটির বাঁধ কেটে দখলমুক্ত করে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করার জন্য খালের দুই পাড়ের ১০টি পরিবার গত ৮ জুলাই পৃথক পৃথক ভাবে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত আবেদন করেছেন। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ১১ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বিষয়টি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ওই আবেদনে বলা হয়, নয়াভাংগুনি গ্রামের হারুন হাওলাদার, বাবুল হাওলাদার, সোহেল হাওলাদার, বাচ্চু চৌকিদার, শহিদুলসহ কতিপয় প্রভাবশালী অন্যায় ও বেআইনিভাবে নয়াভাংগুনি খালে বাঁধ দেওয়ায় সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় বসতবাড়ি পানিবন্দি হয়ে পড়ে। গাছপালার গোড়ায় পানি জমে মরে যাচ্ছে। সরকারি খালে ব্যক্তি মালিকানায় বাঁধ দেওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে খালের পাড়ের বাসিন্দারা। এই অবস্থায় খালের পাড়ের বাসিন্দারা প্রতিকার চেয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবেদন জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাশফাকুর রহমানের নেতৃত্বে খাল দখল মুক্ত অভিযান চলে। ওইদিন তিনটি পুকুরের বাঁধ কেটে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, খালটি দখলমুক্ত করতে এ অভিযান চলমান থাকবে।
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, সব বাঁধ কেটে খালটিকে উন্মুক্ত করে আগের মত পানি প্রবাহ চালু করার। তাহলেই স্থানীয় লোকজন উপকৃত হবে বলে মনে করছেন তারা।
আরও পড়ুন: মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড জয়
অভিযানকালে খালে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করার বিষয়টি স্বীকার করে দখলদাররা জানান, তাদের কেউ কেউ প্রতারণার শিকার হয়েছেন। স্থানীয় বাচ্চু চৌকিদার নামের এক ব্যক্তি টাকার বিনিময় তাদের অনেককে পুকুরের জমি দখল দিয়েছেন। সে অনুযায়ী তারা বাঁধ দিয়ে পুকুর বানিয়ে মাছ চাষ করেছেন।
উপ সহকারি এক কৃষি কর্মকর্তা জানান, গত ১০ জুলাই নয়াভাংগুনি খাস খাল আটকে রেখে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিন পরিদর্শন করছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম। তিনি পরিদর্শন করে নয়াভাংগুনি খালে ৪০টি স্থানে বাঁধ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন। তিনি জানান, খালটি দখলমুক্ত হলে দু’ পাড়ের অন্তত পাঁচশ' পরিবার উপকৃত হবে এবং প্রায় ৩ হাজার একর জমি চাষাবাদের সুবিধা পাবে।
রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাশফাকুর রহমান জানান, গণমাধ্যমকর্মী ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়ে দখলমুক্ত করার অভিযান শুরু করেছেন। খালটি দখলমুক্ত করার আগ পর্যন্ত এ অভিযান চলমান থাকবে বলে জানান তিনি।
একাত্তর/টিএ
