ঢাকা ২৮ মে ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

সুবর্ণজয়ন্তীর বিশেষ সাক্ষাতকারে ড. মোস্তাফিজ

বাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে

জুলিয়া আলম, একাত্তর
প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১০:৫৪:৫০ আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১৮:৫৭:০৩
বাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি'র নির্বাহী পরিচালক ছিলেন তিনি এক দশকেরও বেশি। এখন দেশের অন্যতম থিংক-ট্যাংকটির ফেলো তিনি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষক হিসেবে দেশে-বিদেশে স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। গত ৫ দশকে এদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক বাণিজ্যের অবদান বিশ্লেষণ করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে একাত্তরকে বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এই জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ। জুলিয়া আলম এর সাথে তার দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে এসেছে রপ্তানি খাতের নানা দিক। কথা এসেছে বিশ্ববাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক প্রভাব এবং চীন ভারত, এশিয়া, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও। 

জুলিয়া: পঞ্চাশ বছরে দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক বাণিজ্যের অবদান আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

ড. মোস্তাফিজ: পাঁচ দশকে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে আমরা যে অগ্রগতি সাধন করেছি এতে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে নয়, এখানে কর্মসংস্থান হয়েছে, উদ্যোক্তাশ্রেণি সৃষ্টি হয়েছে। এই উদ্যোক্তারা আবার ভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করেছেন। রপ্তানি বাণিজ্যের অভিজ্ঞ উদ্যোক্তারা অর্থনীতির অন্য অনেক খাতে গেছেন; আবাসন খাতে গেছেন, বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে গেছেন। অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী বিভিন্ন শিল্পে বিনিয়োগ করেছেন। আমরা যখন আমদানি করেছি আমাদের যারা ভোক্তা তাদের কাজে লেগেছে, আমাদের উৎপাদকরাও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কাঁচমাল আমদানি করেছেন। আমদানি বাণিজ্যে সরকারের শুল্ক রাজস্ব খাতে ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। আমদানি বাণিজ্য আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যকেও প্রণোদিত করেছে, দেশের ভোক্তাদের রকমারি পণ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে বাজার সৃষ্টি করেছে। আমাদের দেশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রেখেছে। যখন রেডিমেড গার্মেন্ট শিল্প ৮০'র দশকে শুরু হলো তখন শতকরা ৯০ ভাগই ছিল নারী শ্রমিক। তারা তখন প্রথম ঘর থেকে বেরিয়ে এসে, গ্রাম থেকে শহরে এসে শিল্প খাতে অবদান রেখেছেন । তাদের আয়ও হয়েছে আবার একই সাথে ক্ষমতায়নও হয়েছে। সেটি বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সূচক, দৃষ্টিভঙ্গি, সন্তান গ্রহণ, বিয়ের বয়স সবকিছুতেই ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। বৈদেশিক বাণিজ্য আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, আমাদের পোর্ট, বিভিন্ন ধরনের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, রপ্তানি সেবার সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকাণ্ড, সরকারের নীতিমালা সবকিছুতেই ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। 

জুলিয়া:  কিন্তু আমাদের রপ্তানিতে তো মূল্য সংযোজন খুবই কম। তাই অর্থনীতিতে এর প্রকৃত গুণগত অবদান আসলে কতটকু?

ড. মোস্তাফিজ: ‘দেখুন আমাদের প্রত্যক্ষ রপ্তানি আয় ৪০ বিলিয়ন ডলারের মতো। আমাদের ৪১১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির সাথে তুলনা করলে জিডিপির ১০ পারসেন্টের মতো; এটা যে জিডিপির ৯০ পারসেন্ট তাতো না। কিন্তু এখানে যে বিষয় বিবেচ্য সেটি হলো অর্থনীতিতে যে কোনো কর্মকাণ্ডের একটা গুনক প্রভাব থাকে।’  রপ্তানি কর্মকাণ্ডের সাথে আরো অনেক কর্মকাণ্ড জড়িত। প্রত্যক্ষ রপ্তানি আয় হয়তো ৪০ বিলিয়ন ডলার কিন্তু এথেকে শ্রমিকরা আয় করছেন  তাদের একটা চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে সেই চাহিদার মেটাতে দেশিয় উৎপাদন হচ্ছে। এ খাতে যারা আয় করছেন তারা সঞ্চয় করছেন ব্যাংকে আর ব্যাংক আবার সেটা বিনিয়োগ করছে সুতরাং অনেক ধরনের অভিঘাত হচ্ছে। শুধু রপ্তানি খাত নয়, আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী খাতও আছে এবং সেটাও কিন্তু বড়। দুটো মিলেই বাংলাদেশের অর্থনীতি। রপ্তানি খাতের ভূমিকা একক না । কথাটা হলো আমরা এটাকে আরো বিস্তৃত করতে পারি কিনা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারি কি না। এখনো আমাদের মেজর রপ্তানি রেডিমেড গার্মেন্টস যেটা থেকে মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ পারসেন্টের মতো আসছে। সেখানে আরো পণ্য বৈচিত্রকরণ করতে হবে কাঁচামালের জন্য আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পে নিজেরাই প্রস্তুত করতে হবে । অগ্র এবং পশ্চাৎ সংযোগ শিল্প যদি আমরা বাড়াতে পারি তাহলেই  রপ্তানির নিট আয় আমরা বাড়াতে পারবো।  


জুলিয়া: এদেশে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি যতো হয়েছে শ্রমিকের জীবন মানে উন্নতি ততো হয়নি; বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?

ড. মোস্তাফিজ: আমার মনে হয় যে দেশের উন্নতি- উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বিভিন্ন আর্থসামাজিক সূচকগুলোর উন্নতির সুফল আমাদের শ্রমিকরাও কিছুটা পাচ্ছেন। আমাদের গড় আয়ু স্বাধীনতার সময় ছিল ৪৭ বছর এখন ৭৩, আমাদের শিক্ষার হার বেড়েছে, শিশু মৃত্যু হার ছিল  ১৪১ এটা ৪৩ নেমেছে এর সুফল পেয়েছে শ্রমিকরাও। তারপরও আমি বলবো শ্রমিকদের জীবন মান আরো যেভাবে আরো উন্নতি দরকার ছিল সেটা হয়নি। "পোশাক খাতে ন্যুনতম মজুরিতে ৪ জনের  একটা পরিবার চলেনা মানে দারিদ্রসীমার নিচে আছে শ্রমিক। একজন খেটে খাওয়া মানুষ যিনি ১০-১২ ঘণ্টা ডেইলি খাটেন তার পরিবার যদি দারিদ্রসীমার নিচে থাকে সেটি যেমন বাংলাদেশ আমরা প্রত্যাশা করি তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।" দেশে আয় বৈষম্যও বাড়ছে; আমরা গড়ের কথা বলি যে গড় আয় এখন দুই হাজার পাঁচশ ৫৪ মার্কিন ডলার কিন্তু এর ভেতরে বড় ধরনের বৈষম্য আছে। বৈষম্যটা দেখা যায় যখন জাতীয় আয়ের ওয়েটেড এভারেজে শ্রমিকদের অংশ কত এবং মুনাফার অংশ কত; সেটি ক্রমশ  শ্রমিকদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। সুতরাং এই উন্নয়ন অর্ন্তভুক্তিমূলক করতে হলে, ২০৪১ সালের জন্য সরকারেরই ভিশন-টুয়েনটি ফরটি ওয়ান ডকুমেন্টে যেমন বলা হয়েছে যে আমরা উন্নত বাংলাদেশ করবো অর্ন্তভুক্তিমূলক সমাজ করবো পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন করবো এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। আমার মনে হয় এখানে আরো অনেক কিছু করার আছে। মালিকদের যেমন মজুরির ক্ষেত্রে করার আছে সামাজিক সুযোগ সুবিধা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে সরকারেরও শ্রমিকদের জন্য অনেক কিছু করার সুযোগ আছে আর প্রয়োজনও আছে।

জুলিয়া: ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের সর্বশেষ গতিধারা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কি? এখানে ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির বিষয়গুলোকে আপনি কিভাবে দেখেন?

ড. মোস্তাফিজ: ভারত বাংলাদেশের বাণিজ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের পরেই সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ভারত থেকে যা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের মতো। ‘অবশ্য ভারত থেকে আমাদের আমদানি ভোক্তা, উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের কাজে লাগছে। সমস্যা হচ্ছে ভারত আমদানি করে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা কিন্তু সে তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি নগণ্য। স্বাধীনতার পরে ৪০ বছর লেগেছে আমাদের সেদেশে ১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি করতে।’ ভারত যে এতো আমদানি করে আমরা কেন রপ্তানি করতে পারছি না? আমাদের সরবরাহ সক্ষমতা বাড়িয়ে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করে ভারতের বাজারে সুবিধা নেয়া যায়। ভারত আমাদের শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে সব পণ্যের ক্ষেত্রে অলমোস্ট সেই সুযোগ কাজে লাগানো দরকার। ভিয়েতনামও ভারতের বাজারে রপ্তানির সুযোগ নিচ্ছে । এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা হচ্ছে বিবিআইএম মোটর ভেহিকেল এগ্রিমেন্ট হচ্ছে, মালটিমোডাল কানেকটিভিটি হচ্ছে এগুলো কাজে লাগিয়ে আমরা যদি বিনিয়োগ-বাণিজ্য-যোগাযোগ এই ত্রিমাত্রিক সংযোগ করতে পারি তাহলে ভারতের বাজারে আমরা বড় আকারে ঢুকতে পারবো। 

‘বে অফ বেঙ্গল নিয়ে ভূরাজনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের খুব বড় সুযোগ। ভারত, চীন ও আসিয়ান দেশগুলোর সাথে মিলে আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগগুলো নিতে পারি আমার। এটাই হবে বাংলাদেশের নেক্সট বিগ ভিশন বেস্ট মিশন। বাংলাদেশের সব রপ্তানি ইউরোপ ও নর্থ অ্যামেরিকায় কিন্তু ঘরের কাছে আঞ্চলিক বাজারে হিউজ অপরচুনিটি আমরা নিতে পারছি না।’

এলডিসি থেকে যখন উত্তরণ হবে তখন কিন্তু সব বাজার সুবিধা থাকবে না। আমি মনে করি বাজার সুবিধা নির্ভর প্রতিযোগিতা থেকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীল নির্ভর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জরুরি। এটা করতে গেলে আঞ্চলিক বাজার আঞ্চলিক সহযোগিতা দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ধরনের কম্প্রিহেনসিভ ইকোনোমিক পার্টনারশিপে সমম্বিত নজর দিতে হবে। ভৌগলিক অবস্থান আমাদের খুব বড় সুবিধা দিতে পারে। ব্ল ইকোনোমি মানে এখন আর ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার ভাবলে হবে না, চিন্তা করতে হবে ২ লাখ ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। আমাদের নটিক্যাল সমুদ্রসীমা চিন্তা করেই বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের চিন্তা করতে হবে।

জুলিয়া: চীন বাংলাদেশ বাণিজ্য নিয়ে আপনার সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ কি? এখানে ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির বিষয়গুলোকে আপনি কিভাবে দেখেন? 

ড. মোস্তাফিজ:  চীনের সাথে আমাদের বড় সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। চীন বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগ করছে ভারত তিনটি লাইন অফ ক্রেডিটস দিয়ে ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ সুবিধা দিয়েছে আমাদের যাতে এখন অনেক কিছুই আমরা করছি। চীনেরও নানা ধরনের বিনিয়োগ আছে বাংলাদেশে তারা অবকাঠামো নির্মাণেও সহায়তা করছে। আমাদের দেখতে হবে এগুলো কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়ে চীনের বাজারে ঢুকতে পারছি কি না। ‘চীন আমদানি করে ২২শ বিলিয়ন ডলারের মতো কিন্তু চীনে আমাদের রপ্তানি এখন মাত্র সাত থেকে আটশ মিলিয়ন ডলার মানে এক বিলিয়নও না । মানে আমরা সে বাজারে এখনো ঢুকতেই পারি নাই।’ চীন আমাদের ৯৭ পারসেন্ট পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে কিন্তু আমরা সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে চীনা বাজার ধরতে পারছি না। এখানেও ভারত, চীন আসিয়ান মিলেই বাংলাদেশকে চিন্তা করতে হবে। এখানে অবশ্যই ভূরাজনীতি আছে এখন রোহিংগা সমস্যা আছে। এখন এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা স্বার্থও আছে। বাংলাদেশকে ভারসাম্য বজায় রেখে একবিংশ শতাব্দীর উন্নয়ন কৌশল ঠিক করতে হবে। আমাদের জন্য ভালো হবে, যেটা আমাদের সরকারও বলেছে, সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে বৈরিতা নয়। আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ যেখানে বেশি সে মতো আমাদের কূটনৈতিক ও ব্যবস্থাপনা কৌশল নিতে হবে ।

জুলিয়া: যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য নিয়ে আপনার সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ কি? এখানে ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির বিষয়গুলোকে আপনি কিভাবে দেখেন?

ড. মোস্তাফিজ: যুক্তরাষ্ট্র আমাদের খুব বড় আমাদের বাণিজ্য সহযোগী। যদি একক দেশ হিসেবে বলি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের সবচেয়ে বেশি রপ্তানি তারপরে ইউরোপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো আমাদের জিএসপি বন্ধ করেছে রানাপ্লাজা ঘটনার পর । সেটি আমরা আবার পেতে পারি কি না দেখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের টিকফা চুক্তি আছে মানে আলাপ আলোচনার একটা প্লাটফর্ম আছে। 

‘বহুমুখী বিশ্লেষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক শক্তি, তাদের বাজার অনেক বড় সেখানে আরো বেশি রপ্তানির সুযোগ খুঁজতে হবে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রভাব আছে, এর ভূরাজনৈতিক ইন্টারেস্টও আছে বে অফ বেঙ্গল নিয়ে, আমাদের বড় উন্নয়ন সহযোগী দেশটি থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে এবং দেশটির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে।’

জুলিয়া: বাংলাদেশের সাথে ইউরোপের বাণিজ্য নিয়ে আপনার সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ কি? এখানে ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির বিষয়গুলোকে আপনি কিভাবে দেখেন?

ড. মোস্তাফিজ: সম্মিলিতভাবে ইউরোপ আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার যেখানে শুন্যশুল্ক সুবিধাও আছে। ইইউ বলেছে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে গেলেও তারা আরো ৩ বছর আমাদের এই সুবিধা দেবে। ইউ জিএসপি প্লাস এও আমরা ঢুকতে পারি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে আমাদের একটা ভালো সম্পর্ক আছে এবং তারা বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগীও বটে। ডব্লিউটিওর মতো বিভিন্ন গ্লোবাল  প্লাটফর্মে  বাংলাদেশের ইস্যুগুলোকে সমর্থক হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে পেতে পারি। তবে আমরা দেখছি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন লেবার রাইটস এনভারমেন্টাল রাইটস নিয়ে এখন অনেক বেশি চিন্তা ভাবনা করছে তাই তাদের বাজারে আগামীতে রপ্তানি করতে গেলে আমাদের  শ্রমিক অধিকার তারপর পরিবেশ বান্ধব শিল্পে নজর দিতে হবে না হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি ক্রমান্বয়ে কঠিন হয়ে যেতে পারে। তারা আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে এসব জায়গায় সে বিষয়টা আগামী দিনে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে।

জুলিয়া: বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে মূল্য-সংযোজন কম পণ্যবৈচিত্রও কম। এখানে শিল্পোন্নত দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে নীতি প্রণয়নে বাংলাদেশের দূরদর্শিতার কি অভাব ছিলো?

ড. মোস্তাফিজ:  রেডিমেড গার্মেন্টসই তো রপ্তানির ৮০ পারসেন্ট। এটা খেয়াল রাখতে হবে যে এটি একক পণ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার। এটি এমন এক মার্কেটে যেটি  সাইজ হিউজ। যদি আরো ৫০ টি পণ্যও একত্র করি আমার হয়তো পণ্যবৈচিত্র  হবে কিন্তু এতবড় বাজার হবে না। এখানে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় ফুটপ্রিন্ট রেখেছি আমরা। রেডিমেড গার্মেন্টসে অনেক পণ্যবৈচিত্র্যকরণের সুযোগ আছে। দ্বিতীয়ত আমাদের গ্লোবাল আরএমজি মার্কেটে শেয়ার ৬ পার্সেন্ট আর চীন প্রথম তার ৩১ পারসেন্ট। এখন সবাই বলছে চায়না প্লাস ওয়ান তাই আমরা আরো বাজার নিতে পারি। আমার মনে হয় আরএমজি পণ্যবৈচিত্রকরণ এখনো সম্ভব। আমাদের মতো ২২ আরএমজি রপ্তানি ম্যান-মেইড-ফাইবার আর ৭৮ পারসেন্ট কটন-বেইজড। বৈশ্বিক বাজার কিন্তু উল্টো সেখানে কটন কমছে এবং ম্যান মেইড ফাইবার বাড়ছে। আমাদের সে জায়গাটায় বড় সুযোগ আছে। আমরা কটন থেকে নন-কটনে যেতে পারি রেডিমেড গার্মেন্টসে মূল্য সংযোজন বাড়াতে পারি। নিটওয়্যারে স্থানীয়  মূল্য-সংযোজন প্রায় ৫০-৫৫ পারসেন্ট, ওভেনে ৪০ পারসন্টের  কাছাকাছি। এই জায়গাগুলোতে যদি আমরা পশ্চাৎ সংযোগ বাড়াতে পারি আমদানি প্রতিস্থাপক বিভিন্ন কলকারখানা, ডেনিম, সোয়েটার উপখাতে শক্তি বাড়াতে পারি তাহলে মূল্য সংযোজন বাড়বে। অন্য রপ্তানি উপখাতেও  এনরমাস অপরচুনিটি আছে লেদার দেখেন ফার্মাসিউটিক্যালস দেখেন। আমাদের বিভিন্ন সেবা খাতেও রপ্তানির অনেক সুযোগ আছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৪০ বিলিয়ন ডলার আর ভিয়েতনামের ২৮০ বিলিয়ন ডলার। যদিও তাদের ইকনোমির সাইজ আমাদের থেকে ছোট। তারা এফডিআই আকর্ষণ করতে পারছে অনেক, আমাদেরও করতে হবে।  ইকোনোমিক জোন করা হচ্ছে ১০০ টা তারমধ্যে যদি ২০ টাও আমরা ভালোভাবে চালু করেতে পারি তাহলে কিন্তু এফডিআই আসবে। আর এফডিআই অভ্যন্তরীণ বাজারমূখী হতে পারে। সেজন্য আমাদের নীতিমালা প্রণোদনা পদ্ধতিতে অনেক কিছু করার আছে। প্রথমত আমাদের যেসব প্রতিষ্ঠান আছে ইপিবির মতো এগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে হবে, পোর্টগুলোতে টার্নএরাউন্ড টাইম কস্ট বাড়ায় এবং কস্ট অব ডু্য়িং বিজনেস বাড়ায় এগুলো দেখতে হবে। ইজেডে টেকনোলজি ট্রান্সফার হলো কিনা দেখতে হবে। স্পেশাল ইকনোমিক জোন করছি এখানে দক্ষ শ্রমিক দিতে পারবো নাকি বিদেশ থেকে বিনিয়োগও আসবে আবার শ্রমিকও আসবে? প্রফেশনাল ডেভেলপ করা, দক্ষ শ্রমিক প্রস্তুত করা দক্ষ ব্যবস্থাপক প্রস্তুত করা দরকার। এখন আইটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলিউশন কিন্তু নানা ধরনের সেবা খাতের রপ্তানির সুযোগ দিবে। খেয়াল রাখতে হবে যে পণ্য রপ্তানির যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সাথে সেবা খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ব্যাংকিং সেক্টর যদি ভাল না হয়, ইনস্যুরেন্স যদি ভালো না হয় শিপিং যদি সাশ্রয়ী না হয় তাহলে কিন্তু আমাদের পণ্য রপ্তানিতে  প্রতিযোগিতা সক্ষমতা থাকবে না। সুতরাং প্রণোদনা কাঠামোই পরিবর্তন করতে হবে। দক্ষতা বৃদ্ধিতে যিনি বিনিয়োগ করছেন, টেকনোলজি আপগ্রেডেশনে যিনি বিনিয়োগ করছেন তাকে প্রণোদনা দেন। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রণোদনা কাঠামোগত পরিবর্তন দুটোই দরকার।


জুলিয়া: আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশকে কোথায় দেখছেন? পণ্যবৈচিত্র কি আসতে পারে? এলডিসি থেকে উত্তরণ নিয়ে উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে সরকারি মহলে আবার বাণিজ্য সুবিধা ঝুঁকিতে পড়ায় হতাশাও দেখা যাচ্ছে। আসলে সরকার এবং ব্যবসায়ীদের কি প্রস্তুতি নিতে হবে? 

ড. মোস্তাফিজ: এলডিসি থেকে উত্তরণ অবশ্যই বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের জন্য বিশেষত রপ্তানি খাতের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। ‘সরকার এলডিসি গ্রাজুয়েশনের একটি স্ট্যাটেজি করছে আবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে উচ্চ ক্ষমতার কমিটিও হয়েছে এর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য। সুতরাং সেগুলোর স্ট্রাকচার আমাদের এখানে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কথা হলো যে আগামী ৫ বছরে কিরকম প্রস্তুতি নিতে পারি যাতে উত্তরন টেকসই হয় এবং এই এলডিসি গ্রাজুয়েশনকে যেনো অর্থনীতির জন্য মোমেনটাম করতে পারি সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’ 

জুলিয়া: সিঙ্গাপুর ও কোরিয়াসহ সহ অন্য অনেক দেশ গত পাঁচ দশকে শিল্প ও বৈদেশিক বাণিজ্যে যতো এগিয়েছে আমরা কিন্তু তা পারিনি। এখানে কি সরকার ও নীতিপ্রণেতাদের দূরদর্শিতার অভাব ছিলো? 

ড. মোস্তাফিজ: দেখুন বাংলাদেশ যেভাবে শুরু করেছিল সেটা বিবেচনায় রাখা দরকার। অনেক সময় বলা হয় যে, আমরা দক্ষিণ কোরিয়ার সমপর্যায়ে ছিলাম যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয় কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া এরমধ্যে অনেক অগ্রসর হয়েছে। এটা ঠিক আমরা কার সাথে তুলনা করবো সেটা বিবেচ্য বিষয় কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় হয়েছে। বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৭২ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করলেন তখন কিন্তু একটা বিপর্যস্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতি। পাকিস্তানের শোষণ ২৪ বছরের এবং আমাদের অবকাঠামো নেই, উদ্যোক্তা শ্রেণী নেই এরকম একটা জায়গা থেকে আমরা শুরু করেছিলাম। ৭০ এর দশকে অর্থনীতিবিদদের অনেকে যারা নাকি বিদেশি তারা বলেছেন যে ‘বাংলাদেশ দি টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট’ যে বাংলাদেশ হলো এমন একটা দেশ যেখানে যদি উন্নয়ন সম্ভব হয় তাহলে পৃথিবীর যে কোনো দেশে উন্নয়ন সম্ভব হবে। এজন্য তারা বলেছেন আমরা এটাকে ‘এ টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট’ না বলে দি টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট’ বলেছি । এরকম একটা জায়গা থেকে কিন্তু আমরা উঠে এসেছি। অবশ্যই আমি মনে করি যে আমরা যদি বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ সময় মতো নিতে পারতাম আমাদের উৎপাদনশীলতা দক্ষতাতে আমরা আরো বিনিয়োগ করতে পারতাম, শিক্ষা প্রশিক্ষণে যদি আরো অর্থ ব্যয় করতাম তাহলে হয়তো আমাদের উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, সরবরাহ সক্ষমতা এগুলা আরো বাড়তো এবং হয়তো আরো একটু সামনের দিকে যেতে পারতাম। সেই আত্মসমালোচনা আমার কাছে মনে হয় যে অগৌরবের কিছু না। যা আমরা অর্জন করেছি অবশ্যই সেটাও গৌরব এবং অহংকারের কারণ। কিন্তু আশেপাশে অন্যান্য দেশের সাথে যদি তুলনা করি অনেকের থেকে আমরা ভালো করেছি আর অনেকেই আমাদের চেয়ে এগিয়েও গেছে। অতৃপ্তি একটি শক্তিশালী জাতিয় বোধ কিছুটা অতৃপ্তি থাকবেই। এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাচ্ছে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হয়েছে আমাদের কস্ট অফ বরোয়িং বাড়বে, বাজার সুবিধাগুলো চলে যাবে সেদিক থেকে সামনের দিকে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি হবে। সে মতো প্রস্তুতি আমরা কতটুকু নিতে পারছি সেটাই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জুলিয়া: বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়েছে কিন্তু বৈষম্যও বেড়েছে। এই উন্নয়ন সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কতটুকু টেকসই?     

ড. মোস্তাফিজ:  আমার মনে হয় যে বন্টনের ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের খানা জরিপ যেটা লাস্ট হয়েছিল ২০১৬ এবং আগেরটা ২০১০  দুটোর তুলনা করে আমরা দেখেছি আমাদের জাতীয় আয় বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে কিন্তু বন্টন সূচক ০.৪৬ থেকে ০.৪৮ হয়েছে। আবার এখন কোভিডের ফলে কম আয়ের মানুষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাই বিভিন্ন হিসাবে দেখা যাচ্ছে বণ্টন বৈষম্য আরো বেড়েছে।  সবমিলে যে অর্ন্তভুক্তিমূলক সমাজ ভিশন ২০৪১ ডকুমেন্টে বলা হয়েছে সেখানে যদি আমরা যেতে চাই তাহলে কিন্তু এই বৈষম্য যে অন্যায্য। বৈষম্য বাংলাদেশের অগ্রগতিকেও পেছনে টেনে ধরবে। দুটো কারণ; এক হলো বৈষম্যে সামাজিক বিভিন্ন ধরনের টেনশন বাড়ে- আজকের যুগে সবাই কিন্তু বাইরে কি হচ্ছে কে কিভাবে জীবন যাপন করছে কে কি ক্রয় করছে এগুলো নিজে না পারলেও দেখে। এটা হলো এইজ অফ অ্যাসপিরেশন্স অ্যান্ড অ্যামবিশন্স অবশ্যই এই জায়গায় আমাদের নজর দিতে হবে। 

আমাদের অভ্যন্তরীণ ট্যাক্স কালেকশন মানে ট্যাক্স জিডিপি রেশিও পৃথিবীর সবচেয়ে কম। যাদের সক্ষমতা আছে তারাও ট্যাক্স দিচ্ছে না বা কম দিচ্ছেন। সমাজে ন্যায্য বণ্টনের জন্য বেশি আয়ের মানুষদের থেকে ট্যাক্স নিয়ে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য এগুলোতে ব্যয় করতে হয় সেটি আমাদের দেশে কিন্তু হচ্ছে না। 

‘কম আয়ের মানুষ সংখ্যায় বেশি তাই সমাজে বৈষম্য থাকলে চাহিদা কমে ভোগ কমে এবং সরবরাহ কমে ফলে অর্থনীতি নিম্ন প্রবৃদ্ধির দিকে চলে যেতে পারে। তাই আয় বৈষম্য সম্পদ বৈষম্য ভোগ বৈষম্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ইস্যু; এটি যে কেবল ইনসাফের কথা তা না এর অর্থনৈতিক তাৎপর্যও আছে।’ 

আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক  দুর্বলতাগুলো- সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতি যেগুলো আমাদের অর্থনীতির সম্ভাবনাগুলোকে বাধাগ্রস্ত করছে। এসব জায়গায় যদি, সরকার যেমনটা বলছেন, জিরো টলারেন্স নীতি নেয়া যায় তাহলে সম্পদ আহরণ এবং বণ্টনের ন্যায্যতা দুটোই সম্ভব।

 

একাত্তর/এআর


মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন