নীলফামারীর জলঢাকায় স্কুলছাত্রী ইতি আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে একমাত্র আসামি মাহমুদার রহমানকে (৩৭) মৃত্যুদণ্ড এবং দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
মামলার দীর্ঘ ১৩ বছর পর বুধবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে আসামির অনুপস্থিতিতে এই রায় দেন নীলফামারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ মো. মনসুর আলম।
নিহত ইতি আক্তার (১৫) জলঢাকা মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং জলঢাকা মাথাভাঙ্গা গ্রামের ইয়াকুব আলীর মেয়ে।
ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছেন দণ্ডপ্রাপ্ত মাহমুদার রহমান। তিনি জলঢাকা উপজেলার দুন্দিবাড়ী গ্রামের আফান উদ্দিনের ছেলে বলে জানান নীলফামারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর স্পেশাল পিপি রমেন্দ্র বর্ধন বাপী।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ মতে, ২০০৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেলে জলঢাকা শহরের মাথাভাঙ্গা গ্রামস্থ বাড়িতে ইতি আক্তারকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন মাহমুদার রহমান।
এ ঘটনার পরদিন (১ অক্টোবর) ইতি আক্তারের বাবা ইয়াকুব আলী বাদি হয়ে মাহমুদারকে একমাত্র আসামি করে জলঢাকা থানায় ধর্ষণ ও হত্যা মামলা দায়ের করেন।
জলঢাকা থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত শেষে ২০১০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মাহমুদার রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ওই মামলার ১৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে দীর্ঘ ১৩ বছর পর বুধবার আসামির অনুপস্থিতিতে বিজ্ঞ আদালতের বিচারক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালতের বিশেষ পিপি রমেন্দ্র বর্ধন বাপ্পী। তাকে সহযোগিতা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হারেস মর্তুজা ও লায়লা আঞ্জুমান আরা ইতি।
অপরদিকে মামলার আসামি মাহমুদার রহমানের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স হিসেবে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী আব্দুল লতিফ সরকার।
বাদীকে আইনি সহায়তা প্রদানকারী আইনজীবী লায়লা আঞ্জুমান আরা ইতি জানান, ঘটনার পর আসামি উচ্চ আদালতে জামিনের প্রার্থনা করলে উচ্চ আদালত তাকে চার সপ্তাহের মধ্যে নিম্ন আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু আসামি নিম্ন আদালতে হাজির না হয়ে পলাতক থাকায় তার অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য সম্পন্ন হয়।
নিহত ইতি আক্তারের বড় ভাই মো. শরিফুল ইসলাম জানান, ‘অনেক দেরিতে রায় হলেও এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। এখন আমরা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি জানাচ্ছি।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালতের বিশেষ পিপি রমেন্দ্র বর্ধন বাপ্পী বলেন, আদালতের মাধ্যমে বাদিপক্ষকে আমরা ন্যায়বিচার দিতে পেরেছি। এজন্য আমরা বিজ্ঞ আদালতের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি পলাতক রয়েছে, তাকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত রায় কার্যকর করা হবে।
আরও পড়ুন: খালে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ: মৎস্যচাষীর কারাদণ্ড
তবে মেয়ের হত্যাকারীর শাস্তি দেখে যেতে পারলেন না ইয়াকুব আলী। মামলা দায়েরের সময় ইয়াকুব আলীর বয়স ছিল ৭০ বছর। অনেক আশা ছিল নিজ চোখে মেয়ে হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড দেখবেন। সেই আশায় জেলা জজ আদালত চত্বরের বিভিন্ন স্থানে দৌঁড়ঝাঁপ করেছিলেন। মামলায় সাক্ষীও দিয়েছিলেন তিনি। অবশেষে ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ইয়াকুব আলীর।
মামলার রায় হওয়ার পর পরিবারের বড় ছেলে মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ওই মামলার বাদি ছিলেন আমার বাবা। দীর্ঘ ১৩ বছর পর মামলা রায় হলে, আমার ন্যায় বিচার পেলাম কিন্তু সেই বিচার দেখে যেতে পারলেন না বাবা। তিনি আজ বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন।’
