নদীর বেড়িবাঁধের পাশে পড়ে ছিল রক্তাক্ত মরদেহ। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছিল, সেখানেই হয়ত হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু মরদেহের মাথা ও কানের পাশে লেগে থাকা ঘুণ পোকার গুঁড়োতেই আটকে যায় তদন্তকারীদের নজর। ক্ষুদ্র এই আলামতই শেষ পর্যন্ত খুলে দেয় ক্লুলেস হত্যার রহস্য।
মাত্র ১৬ ঘণ্টার তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের হরিণপালা এলাকায় ইসমাইল শরীফকে (৬০) বেড়িবাঁধে নয়, তার নিজের বসতঘরেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরে হত্যার ঘটনা আড়াল করতে মরদেহ নিয়ে বেড়িবাঁধ এলাকায় ফেলে রাখা হয়।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী শেফালী বেগম এবং তিন ছেলে রুবেল শরীফ, রুমান শরীফ ও রাসেল শরীফকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা কুঠারসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) রাতে ভাণ্ডারিয়া থানায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে তেলিখালী ইউনিয়নের বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায় রক্তাক্ত একটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে নিহতের পরিচয় শনাক্ত হয়—তিনি হরিণপালা এলাকার ইসমাইল শরীফ।
মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি প্রথমে ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড হিসেবে সামনে আসে। মরদেহ ময়নাতদন্তে পাঠানোর পাশাপাশি ছায়া তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই জয়নাল শরীফ বাদী হয়ে ভাণ্ডারিয়া থানায় একটি হত্যা মামলাও করেন।
প্রাথমিকভাবে সন্দেহের তালিকায় ছিলেন নিহতের স্ত্রী ও তিন ছেলে। তাদের থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও শুরুতে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন তারা।
তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মেলে মরদেহের সুরতহাল ও ছবি বিশ্লেষণের সময়। তদন্তকারীদের নজরে আসে, নিহতের মাথা ও কানের পাশে লেগে আছে কাঠখেকো ঘুণ পোকার গুঁড়ো।
এ আলামত থেকেই পুলিশের সন্দেহ হয়, হত্যাকাণ্ডের মূল ঘটনাস্থল বেড়িবাঁধ নয়। মরদেহ অন্য কোথাও হত্যার পর সেখানে এনে ফেলে রাখা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন তদন্তকারীরা।
একপর্যায়ে নিহতের বসতঘরে গিয়ে পাওয়া যায় ধস্তাধস্তির চিহ্ন, মাটির মেঝেতে রক্তের দাগ এবং বারান্দার চালার বাঁশ ও কাঠের গুঁড়ো। মরদেহে থাকা ঘুণ পোকার গুঁড়োর সঙ্গে এসব আলামত মিলে যাওয়ায় তদন্তকারীদের কাছে স্পষ্ট হয়, হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে ইসমাইল শরীফের নিজের ঘরেই।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে নিহতের ছোট ছেলে রাসেল শরীফের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বারান্দার খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা কুঠার।
পরে রাতে সিআইডির ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। এর মধ্যে রয়েছে রক্তমাখা মাটি ও ঘুণ পোকার গুঁড়ো। নিহতের স্ত্রী শেফালী বেগমের শরীরেও রক্তের চিহ্ন পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের বিষয়টি সামনে এসেছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ ও মারামারি হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং এতে প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্ত শেষে পরিষ্কার হবে বলে জানিয়েছে তারা।
ভাণ্ডারিয়া থানার ওসি দেওয়ান জগলুল হাসান বলেন, মরদেহের সঙ্গে থাকা ক্ষুদ্র আলামত বিশ্লেষণ করে তদন্তের দিক পরিবর্তন করা হয়। পরে বিভিন্ন তথ্য ও আলামতের ভিত্তিতে মাত্র ১৬ ঘণ্টায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তার চারজনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষা ও অধিকতর তদন্ত শেষে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।
জামালপুরে ট্রাকে প্রাইভেটকারের ধাক্কা, সহকারী জজ নিহত
ভুয়া তথ্য ও সাইবার বুলিং মোকাবিলায় বাস্তবতা ও করণীয়
নাইকির সাথে এমবাপের ২০ বছরের সম্পর্ক শেষ!
রিয়াদে নিহত ১৬ বাংলাদেশির পরিচয় শনাক্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ডিএনএ পরীক্ষা