লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যার এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো উন্মোচিত হয়নি সেই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য। সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদার একাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন নাকি তার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল—তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তদন্তে এরই মধ্যে উঠে এসেছে তার ভুয়া পরিচয় ব্যবহারের তথ্য।
আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও দ্রুত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবিতে স্থানীয়রা মানববন্ধন করেছেন। এক মাস অতিবাহিত হলেও নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিভিন্ন মসজিদে দোয়া মাহফিল, পারিবারিক মিলাদ ও কবর জিয়ারতের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সিফাতের স্বজনরা।

এক মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তে এখনো কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতির কথা জানাতে পারেনি পুলিশ। স্থানীয়দের ভাষ্য, রহস্যের জট না কাটায় রায়পুরে মানুষের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য বলছেন, উদ্দেশ্য ছাড়া এমন হত্যাকাণ্ড হতে পারে না।
রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীপাড়ের একটি ভাড়া বাসা। দরজায় ঝুলছে তালা। বাইরে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকে ১৬ বছরের জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। তার দৃষ্টি যেন খুঁজে ফেরে পরিচিত সেই মুখগুলোকে। মনে হয়, এই বুঝি ভেতর থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে আসবেন মা শাহিনুর বেগম। পেছন পেছন ছুটে আসবে তিন বোন—সায়মা, ইকরা আর শিফা। এক মাস আগে এই ঘরেই নৃশংসভাবে খুন হন সিফাতের মা ও তিন বোন।

মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় একটি পরিবার। আর বেঁচে থাকে শুধু সিফাত—কারণ ঘটনার সময় সে কর্মস্থলে ছিল। আজও সেই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হয়নি। কেন হত্যা করা হলো? একজন, নাকি একাধিক ব্যক্তি জড়িত ছিল? উদ্দেশ্য কী ছিল?—এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
গত ২৫ জুন দিনের আলোতে বেলা ১১টার দিকে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে শাহিনুর বেগম, তার মেয়ে সায়মা ও শিফার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ইকরাকে। ঢাকায় নেওয়ার পথে তারও মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর স্থানীয়রা সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদারকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। অন্তর নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি রায়পুরে ফেরি করে ফল বিক্রি করতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে উঠে এসেছে, সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদার ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন এলাকায় বসবাস করেছিলেন। প্রায় দেড় বছর আগে তিনি অন্তর মিয়াজী পরিচয়ে একই ভবনে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। স্থানীয়দের দাবি, তিনি এক নারীকে স্ত্রী পরিচয়ে সেখানে রাখতেন। পরে পরিচয় নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে বাসা ছেড়ে দেন। তার ব্যবহৃত জাতীয় পরিচয়পত্র এখন পুলিশের জিম্মায় রয়েছে।

এদিকে এক মাস পেরিয়ে গেলেও তালাবদ্ধ সেই ঘরটি আজও রায়পুরবাসীকে মনে করিয়ে দেয়—একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড কীভাবে মুহূর্তেই একটি পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।
২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান সিফাতের বাবা কামাল উদ্দিন। এরপর চার সন্তানকে নিয়ে সংগ্রামের জীবন শুরু করেন শাহিনুর বেগম। অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না। মা সন্তানদের পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরেছিল সিফাতও। একাদশ শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি মা ও তিন বোনের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু এক বিকেলেই সব শেষ হয়ে যায়। এখন পৃথিবীতে কার্যত একাই সিফাত।
তার কণ্ঠে শুধু একটি প্রশ্ন—আমার মা আর তিন বোনকে কেন হত্যা করা হলো?

পুলিশ মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক আলামত ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করছে। শুরুতে হত্যাকাণ্ডের পেছনে লুটপাটের উদ্দেশ্যের কথা বলা হলেও পরে বাসা থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা উদ্ধার হয়। তবে পরিবারের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন কেন সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন—অন্তর একাই কি চারজনকে হত্যা করেছে, নাকি তার সঙ্গে আরও কেউ ছিল?
মা ও তিন বোনকে আর কোনোদিন ফিরে পাবে না সিফাত। তবে তার বিশ্বাস, একদিন এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে এবং যারা তার পরিবারকে কেড়ে নিয়েছে, তারা আইনের মুখোমুখি হবে।
সিফাত জানান, তার মা ও তিন বোনকে হারিয়ে দুটি চাওয়া। প্রথমটি—মা ও তিন বোন হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিচার। দ্বিতীয়টি—একবারের জন্য হলেও দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা।
সিফাত আরও বলে, আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোনো টাকা চাই না। আমি শুধু চাই তিনি আমার মাথায় একবার হাত রাখুন। আমি যেন মনে করি, আমারও একজন অভিভাবক আছেন। আর যারা আমার মা ও তিন বোনকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার যেন হয়।
উদ্দেশ্য ছাড়া এমন হত্যাকাণ্ড হয় না এমন প্রশ্ন ছুড়ে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, এই হত্যাকাণ্ড উদ্দেশ্য ছাড়া হয়নি। এর পেছনে অবশ্যই কোনো কারণ রয়েছে। সেই উদ্দেশ্য কী এবং কারা জড়িত, তা দ্রুত উদ্ঘাটন করতে হবে। আমি চাই পুলিশ প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনুক।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, তদন্তের সব দিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত আলামত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন, জড়িতদের শনাক্ত এবং আইনের আওতায় আনতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
খুঁটিতে বেঁধে কুকুর পিটিয়ে হত্যায় আসামি দুই, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চাকা পাংচার হয়ে বাস খাদে, আহত ১২