বঙ্গোপসাগরে এখন কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না, তার ওপর যোগ হয়েছে জলদস্যুতার আতঙ্ক। তবে সাধারণ কোনো ডাকাত দল নয়; অভিযোগ উঠেছে, মাছ ধরার আড়ালে বড়ো ট্রলার নিয়ে একশ্রেণির জেলে রূপী দস্যু হামলা চালাচ্ছে ছোট ও মাঝারি ট্রলারে। জাল, মাছ, জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে খাবারদাবার পর্যন্ত লুট করে নিয়ে যাচ্ছে তারা। বাধা দিলে মিলছে মারধর। এমন পরিস্থিতিতে জীবন ও নৌযানের নিরাপত্তায় সাগরে না গিয়ে পটুয়াখালীর উপকূলে ট্রলার নোঙর করে বসে আছেন শত শত জেলে।

সরেজমিন, শুক্রবার ও শনিবার পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের মৎস্য ট্রলারঘাট এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে নোঙর করে রাখা অসংখ্য ট্রলার। শুধু রাঙ্গাবালী নয়, গলাচিপাসহ আশপাশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার জেলেরাও নিরাপত্তার আশায় এই ঘাটে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। কোনো কোনো ট্রলার গত সাত থেকে ১৫ দিন ধরে ঘাটে অলস বসে আছে।
দস্যুতার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে চরমোন্তাজ ঘাটের অনেক জেলেই ক্যামেরা বা রেকর্ডিংয়ের সামনে আসতে রাজি হননি। তাদের ভয়—ছবি বা নাম প্রকাশ পেলে সাগরে নেমে আবার আক্রমণের শিকার হতে হবে।

যেভাবে চলছে দস্যুতা
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাঙ্গাবালী উপজেলার সোনারচর এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরের মাঝ বয়া ও শেষ বয়া থেকে বঙ্গোপসাগরের গভীর অংশ পর্যন্ত এই দস্যুতা বিস্তৃত। ভুক্তভোগীদের দাবি, হামলাকারীরা সাগরে বড়ো ট্রলার নিয়ে অবস্থান করে। বাইরে থেকে তাদের সাধারণ জেলে মনে হলেও সুযোগ বুঝে তারা ছোট ও মাঝারি আকৃতির ট্রলার লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সোনারচর সংলগ্ন সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে দস্যুতার শিকার হন রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ এলাকার বাসিন্দা এলমেছ আলী সরদারের ট্রলারের জেলেরা। ট্রলারে থাকা এলমেছ আলীর ছেলে বশির মাঝি বলেন, হঠাৎ করে একটি বড়ো ট্রলার আমাদের ওপর চড়াও হয়। তারা আমাদের জাল, সংগৃহীত মাছ ও খাবারদাবার লুট করে নেয়। বাধা দিতে গেলে আমাকে মারধর করা হয়।
গলাচিপার উলানিয়া এলাকার ‘এমবি রুবিনা’ ট্রলারের মাঝি জামাল জানান এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। তিনি জানান, কয়েক দিন আগে সাগরে তার ও তার চাচার ট্রলারে একযোগে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা জাল-তেল লুট করার পাশাপাশি তার চাচাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে সাগরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে তাকে উদ্ধার করে বরিশাল হাসপাতালে আট দিন চিকিৎসা করাতে হয়েছে।
মাঝি জামাল জানান, হামলাকারীদের কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে তারা পশ্চিমাঞ্চলের লোক। তারা ‘এমবি কৈশী-২’ ও ‘এমবি কৈশী-৪’ নামের দুটি ফিশিংবোট ব্যবহার করছিলো। একই ধরনের অভিযোগ করেন গলাচিপার বাদনাতলী গ্রামের জেলে আল আমীন।

ভয়, নীরবতা ও আইনি প্রক্রিয়ার অভাব
সোনারচর এলাকায় দস্যুতার অভিযোগে সম্প্রতি দুই সপ্তাহ আগে দশমিনা উপজেলার রণগোপালদী এলাকার আবু তালেব গাজীর ট্রলারে হামলার ঘটনা ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী জেলেরা সন্দেহভাজন হিসেবে একটি ট্রলারসহ ৯ জনকে ধরে নৌপুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে দস্যুতার মামলার পরিবর্তে মৎস্য সংরক্ষণ আইনে মামলা করা হয়েছে।
জেলেদের দাবি, গত এক মাসে অন্তত ডজনখানেক দস্যুতার ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশই থানায় বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে চান না। খোয়া যাওয়া মালামাল ফিরে না পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং ট্রলারের নাম প্রকাশ পেলে পরবর্তীতে সাগরে নতুন করে হামলার ভয়ে নীরব থাকছেন তারা। পাশাপাশি সাগরে বিপদে পড়লে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক সহায়তা না পাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
গভীর সাগরে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে রাঙ্গাবালী নৌপুলিশের ইনচার্জ আন নূর যায়েদ বলেন, গভীর সাগর আমাদের কাজের এখতিয়ারভুক্ত এলাকার বাইরে। তবে আমাদের আওতাধীন অংশে দস্যুতা বা ডাকাতির কোনো ঘটনা ঘটেনি। জেলেদের নিরাপত্তার জন্য নৌপুলিশের টহল অব্যাহত রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর দেওয়া আছে। খবর পেলেই তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ভিক্টর বাইন জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন এবং ঊর্ধ্বতন জেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন। সাগরে যৌথ অভিযান চালানের জন্য কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশকে অনুরোধ করা হবে বলে জানান তিনি।

জীবিকায় বড়ো ধাক্কা
আগামী আট অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞার ঠিক আগের এই সময়টি জেলেদের জন্য উপার্জন ও ধারদেনা পরিশোধের সবচেয়ে বড়ো সুযোগ।
সামগ্রিক বিষয়ে মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, বঙ্গোপসাগরে এখন পর্যন্ত জেলেদের জন্য কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়নি। সোনারচর থেকে গভীর সাগর পর্যন্ত দস্যুতার কারণে উপকূলীয় জেলেদের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। মা ইলিশের নিষেধাজ্ঞার আগে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যদি জেলেরা সাগরে যেতে না পারেন, তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কট আরও তীব্র হবে। এই মুহূর্তে কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও নৌবাহিনীর সমন্বিত টহল জোরদার করা জরুরি।
